ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশে মাছ, পানি ও টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক—মানবদেহে কতটা বিপজ্জনক?
ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ১৬ আগস্ট:
নদী-সাগরের মাছ, শাকসবজি কিংবা টুথপেস্ট—দৈনন্দিন জীবনের নানা উপাদানের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে প্রবেশ করলেই যে তাৎক্ষণিক ক্ষতি করবে, এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই। তবে শরীরে এর মাত্রা বাড়তে থাকলে বিভিন্ন অঙ্গ ও কোষে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে যেমন এসব কণা তৈরি হয়, তেমনি বিভিন্ন প্রসাধনী ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের মাধ্যমেও তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) দাবি করেছে, বাংলাদেশে বাজারজাত ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের গবেষকেরা তিন বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে সাগর, নদী, বিল ও হাওরের বিভিন্ন মাছের দেহে এসব ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি পেয়েছেন।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর, ব্রহ্মপুত্র নদ, চলনবিল ও আড়িয়াল বিল থেকে সংগৃহীত অন্তত ১৩ ধরনের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসেও এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। আড়িয়াল বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম ও কুয়াকাটা থেকে সংগৃহীত বোম্বে ডাক, রিবন ফিশ ও ফাইসা মাছেও এর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন গবেষকেরা।
অধ্যাপক মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল ফাইবার আকৃতির এবং এগুলোর আকার ১০১ থেকে ৩০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে। কই মাছে গড়ে ১ থেকে ১ দশমিক ৯০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
তবে এসব কণার ‘নিরাপদ মাত্রা’ এখনো নির্ধারিত হয়নি। অধ্যাপক শাহজাহানের ভাষ্য, অন্যান্য দূষক পদার্থের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নির্ধারিত মান থাকলেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষেত্রে এখনো বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য কোনো মানদণ্ড নেই।
ইঁদুরের শরীরে মিলেছে একাধিক ক্ষতির প্রমাণ
মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব জানতে বাংলাদেশের একদল গবেষক ইঁদুরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করেছেন। আন্তর্জাতিক Emerging Contaminants সাময়িকীতে সম্প্রতি প্রকাশিত ওই গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামানসহ চার গবেষক অংশ নেন।
গবেষণায় প্রায় ১২৫ মাইক্রোমিটার আকারের পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন মাত্রায় ইঁদুরের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে ১৩ সপ্তাহ খাওয়ানো হয়। খাবারে ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ হারে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশিয়ে এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক ইঁদুরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। একই সঙ্গে রক্তকণিকার গঠনে অস্বাভাবিকতা, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং যকৃৎ, অন্ত্র ও কিডনির টিস্যুতে ক্ষতিকর পরিবর্তন দেখা যায়। মাইক্রোপ্লাস্টিকের জমা হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে অন্ত্রের টিস্যুতে।
গবেষক অধ্যাপক ফিরোজ জামান বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাবে আয়ুষ্কাল কমে যাওয়া, কিডনি ও যকৃতের ক্ষতি এবং কোষের ক্ষতিসহ একাধিক ধরনের বিরূপ প্রভাব দেখা গেছে।
তবে ইঁদুরের ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে ঘটবে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যায় না। বরং মানবদেহে কী মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, সেটি নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
খাদ্যচক্রে ঢুকছে কীভাবে
গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-খাল-বিল ও সাগরে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। মাছ এসব কণা গ্রহণ করে। দূষিত পানি দিয়ে ফসল উৎপাদন হলে সেখান থেকেও খাদ্যচক্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে।
অধ্যাপক ফিরোজ জামান বলেন, মাছের মাধ্যমে যেমন এসব কণা মানুষের শরীরে আসতে পারে, তেমনি দূষিত পানি শস্যের কোষে প্রবেশ করার পর শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পৌঁছাতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আরও ক্ষুদ্র হয়ে ন্যানোপ্লাস্টিকে পরিণত হলে ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক শাহজাহান। তাঁর মতে, এসব অতি ক্ষুদ্র কণা রক্তপ্রবাহ বা বিভিন্ন টিস্যুতে জমা হলে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে।
বর্ষায় বাড়ে পানির মাইক্রোপ্লাস্টিক
গবেষণায় ঋতুভেদে পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্বেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। বর্ষায় বৃষ্টির পানির সঙ্গে আশপাশের প্লাস্টিক বর্জ্য বিল ও জলাশয়ে প্রবেশ করায় দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। পানির প্রবাহ বেশি থাকায় কণাগুলো পানির স্তরে ভেসে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে এসব কণা ধীরে ধীরে তলদেশে জমা হয়।
কর্ণফুলী নদীতেও মাছের দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, নদীর তলদেশে জমে থাকা পলিথিন ও অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য সময়ের সঙ্গে ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হচ্ছে।
অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ
জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন—কীভাবে খাদ্য ও পানীয় থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক আলাদা করা যায় এবং কীভাবে দূষণ কমানো সম্ভব, তার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দেশেই বের করতে হবে।
প্লাস্টিকের বোতলে পানি পান এবং একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিনের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সমাধান ব্যবস্থাপনায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকের ব্যবহার একেবারে বন্ধ করা বাস্তবে কঠিন হলেও এর ব্যবহার কমানো এবং ব্যবহৃত প্লাস্টিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো জরুরি। পুনর্ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্লাস্টিককে নিয়ন্ত্রিত রাখার ওপরও জোর দিতে হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন বৈশ্বিক সমস্যা, শুধু বাংলাদেশের নয়। বিষয়টি নিয়ে আরও জানার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দূষণ ঠেকাতে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গবেষকদের আশঙ্কা, এখনই প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে খাদ্যচক্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে। আর মানবদেহে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরোপুরি বোঝার আগেই দূষণের মাত্রা আরও বেড়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।