মুক্তিযুদ্ধের ব্যক্তিগত ও পরিবারের স্মৃতিকথা অবলম্বনে
বীরত্বের স্মৃতি ‘৭১
১৯৭১ সালের কথা। তারিখটা মনে নেই ঠিক, তবে মনে আছে, মাসটি ছিল সেপ্টেম্বর। তখন সারা দেশ এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে দগ্ধ। শহরগুলো ঝড়ের মত উত্তপ্ত, আর গ্রাম–গঞ্জের মানুষরা নিরাপত্তাহীনতায় কাঁপছে। সেই উত্তাল সময়ে, আমি একদিন মা–বাবার সামনে চুপচাপ বসে বললাম, “আমি যুদ্ধে যাব।”
আমার সঙ্গে ছোট ভাই আবুল কাশেমও যেতে চাইল। তার চোখে ঝিলমিল করছিল এক রকম অদম্য সাহস। কিন্তু বাড়ির কেউ আমাদের যেতে দিতে চাইল না।

বাবা বললেন, “এটা তোমাদের জন্য নয়, ছেলেমেয়েরা খেলতে খেলতেই থাকুক।” মা চোখে জল নিয়ে শর্ত দিলেন, “যদি সত্যিই যেতে চাও, জীবনের সব বিপদের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
আমরা জেদ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। শহরের উচ্ছৃঙ্খল রাস্তা পেরিয়ে, গ্রামের ছোট্ট পথ ধরে এগোতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি পাথর, প্রতিটি গাছ আমাদের মুক্তির ডাক শুনছে। কয়েক ঘণ্টার হাঁটার পর আমরা পৌঁছলাম মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে। ক্যাম্পটি আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে, কিন্তু সেই দূরত্ব মনে হয়নি, কারণ লক্ষ্য একটাই—দেশকে মুক্ত করা।
ক্যাম্পে পৌঁছালে সেখানে মোট ২৪ জন যোদ্ধা ছিল। কেউ অভিজ্ঞ, কেউ নবীন—কেউ শিক্ষিত, কেউ সাধারণ কৃষক। কিন্তু প্রত্যেকের চোখে একরকম অদম্য আগুন। আমরা সবাই জানতাম, এ যুদ্ধ সহজ হবে না। কিন্তু আমরা চাইছিলাম, স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তব হোক।
প্রথম দিনই বুঝতে পারলাম, যুদ্ধ মানেই কেবল বন্দুক বা বোমা নয়, সাহস, ধৈর্য এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাসও খুব বড় অস্ত্র। রাতগুলো ছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে, খোলা আকাশের নিচে; ঠিক তখনই আবুল কাশেম হাতের তালুতে হাত রেখে বলল,
“ভাই, আমরা ঠিক করেছি, শেষ পর্যন্ত লড়ব। যদি আমরা না থাকি, কেউ থাকবে।”
সেই সেপ্টেম্বর-এর দিনগুলো আজও মনে হয় অচেনা স্বপ্নের মত—যেখানে ভয়, বীরত্ব, আশা আর ত্যাগ একত্রিত হয়েছিল। ছোট দুই ভাই, ২৪ জন যোদ্ধা এবং একটি ছোট্ট ক্যাম্প—এমনই শুরু হয়েছিল আমাদের মুক্তির যাত্রা।