পবিত্র কোরআন: ইতিহাস, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার চূড়ান্ত গ্রন্থ

পবিত্র কোরআন: ইতিহাস, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার চূড়ান্ত গ্রন্থ

।। মো. জিল্লুর রহমান ।।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হলো আল-কোরআন। ভাষা, বর্ণনা, সাহিত্যশৈলী, কাব্যিক ছন্দ, গদ্যরীতি, রসবোধ এবং উপমাসমৃদ্ধতার দিক থেকে এটি বিশ্বের সকল গ্রন্থকে অতিক্রম করেছে। এই মহাগ্রন্থের নির্মাতা স্বয়ং আল্লাহ এবং এটি অবতীর্ণ হয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর। সত্যিই আশ্চর্যজনক যে, এই মহাগ্রন্থ নাযিল হয়েছিল একজন নিরক্ষর আরবের উপর। যদি এটি কোনো শিক্ষিত পণ্ডিতের ওপর নাযিল হতো, তবে অনেকেই বলত এটি তার নিজস্ব সৃষ্টিশীল গ্রন্থ।

পবিত্র কোরআনে শুধু আল্লাহর নির্দেশনা নয়, পূর্ববর্তী উম্মতের ইতিহাস, তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আইন এবং বিভিন্ন ঘটনা সংক্ষেপে এবং সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কাহাফবাসীর ঘটনা, ইব্রাহিম (আ.) এর কাবা নির্মাণ, মুসা (আ.) ও তার জাতির নীলনদ পারাপার, মান্না ও সালওয়ারের খাদ্যাভ্যাস, ঈসা (আ.) ও তাঁর পবিত্র মাতার কাহিনী—এসব ইতিহাস কোরআনে সত্যের প্রতিফলন। এটি ইতিহাসবিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ ও বিজ্ঞানীদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।

কোরআনের স্থায়িত্ব ও মুজেজা অন্য নবী ও প্রেরিত গ্রন্থের সাথে তুলনা করলে আরও স্পষ্ট হয়। অতীতের নবীদের উপর অবতীর্ণ কিতাব বা মুজেজা নির্দিষ্ট জাতি বা সময়কাল পর্যন্ত প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ কোরআন আজও, কিয়ামত পর্যন্ত, অক্ষুণ্ণ ও কার্যকর। এটি সময়ের সাথে সাথে পুরনো ও নতুন প্রজন্মের জন্য একইভাবে প্রাসঙ্গিক।

আল-কোরআন সংক্ষিপ্ত হলেও এর বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি অসীম। প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও আয়াত তাত্ত্বিক, তথ্যভিত্তিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। এই কারণে অমুসলিম মনীষীরা বারবার কোরআনের গভীরতা ও বিশালতা স্বীকার করেছেন। সামাজিক, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক এবং নৈতিক জ্ঞান আহরণের জন্য তারা কোরআনের দ্বারে ফিরে এসেছেন। যেমন, বিশিষ্ট ফরাসি শল্যচিকিৎসক ড. মরিস বুখাইলি তার “বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান” গ্রন্থে লিখেছেন:

“কোরআন এমন একটি গ্রন্থ যা আধুনিক বিজ্ঞান এবং যুক্তির বিচারে প্রতিটি আয়াত সত্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি বিজ্ঞানের জন্য একাডেমী, ভাষাবিজ্ঞানীদের জন্য অভিধান, ব্যাকরণবিদদের জন্য ব্যাকরণের বই, কবিদের জন্য ছন্দময় সাহিত্য এবং আইনবিদদের জন্য একটি এনসাইক্লোপিডিয়া।”

কোরআন একমাত্র গ্রন্থ যা সমগ্র মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ। পূর্ববর্তী নবীদের গ্রন্থ ছিল নির্দিষ্ট সম্প্রদায় ও সময়ের জন্য। কোরআন সর্বজনীন, যা প্রতিটি যুগে মানব জীবনের সকল দিক—নৈতিকতা, আইন, সমাজনীতি, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, এবং আধ্যাত্মিকতার দিক নির্দেশনা প্রদান করে।

এতে ভবিষ্যৎবাণীরও প্রমাণ রয়েছে। যেমন, সুরা আর-রুম এর আয়াত ১-৪ এ উল্লেখ আছে যে, রোম সাম্রাজ্য প্রাথমিকভাবে পরাজিত হবে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিজয় অর্জন করবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, কোরআনের এই পূর্বাভাস যথাযথভাবে পূর্ণ হয়েছে।

কোরআনের পাঠ ও শ্রবণ মুমিনদের জন্য অত্যন্ত মহিমান্বিত। প্রতিটি হরফে সওয়াব নির্ধারিত, যেমন হাদিসে এসেছে:

“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকি দশগুণ বৃদ্ধি পাবে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০)

পৃথিবীতে একমাত্র অপরিবর্তিত গ্রন্থ হল কোরআন। অবতীর্ণের দেড় হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে এর কোনো অক্ষর, হরফ বা সাকিন পরিবর্তিত হয়নি। খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক বাডল উল্লেখ করেছেন, “কেবল কোরআনই এমন একটি গ্রন্থ, যা দেড় হাজার বছরের ব্যবধানেও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। অন্য ধর্মগ্রন্থের সাথে তুলনীয় নয়।”

সুতরাং, কোরআন শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি মানবতার ইতিহাস, বিজ্ঞানের জ্ঞান, নৈতিক শিক্ষা, সমাজনীতি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অমোঘ নির্দেশিকা, যা যুগে যুগে মানুষের জন্য আল্লাহর করুণাময় দিক নির্দেশনার উৎস।