প্রথমবার স্পষ্ট হলো ৩০ হাজার বছর আগের মানবগোষ্ঠী ডেনিসোভানদের মুখাবয়ব !

প্রথমবার স্পষ্ট  হলো  ৩০ হাজার বছর আগের মানবগোষ্ঠী ডেনিসোভানদের মুখাবয়ব  !

ইতিহাস ও  ঐতিহ্য ডেস্ক, ২৮ ডিসেম্বর :  ডেনিসোভানরা দেখতে কেমন ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর এত দিন অধরাই ছিল। অবশেষে সেই ধোঁয়াশা কাটাল জীবাশ্মবিজ্ঞানীদের এক সাম্প্রতিক গবেষণা। প্রায় ৯২ বছর আগে চিনের হারবিন শহরে পাওয়া একটি প্রাচীন মানবখুলির প্রোটিন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, সেটি আসলে বিলুপ্ত মানবগোষ্ঠী ডেনিসোভানদেরই জীবাশ্ম।
আধুনিক বিশ্ব প্রথম ডেনিসোভানদের অস্তিত্বের কথা জানতে পারে ২০১০ সালে। সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া একটি কড়ে আঙুলের হাড় থেকে ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই আদিম মানবপ্রজাতির পরিচয় মেলে। জানা যায়, প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর থেকে ৩০ হাজার বছর আগে পর্যন্ত তারা পৃথিবীতে বিচরণ করত। একই সময়ে নিয়ান্ডারথাল ও আধুনিক মানুষ—হোমো সেপিয়েন্স—ও পৃথিবীতে ছিল।


তবে এত দিন পর্যন্ত ডেনিসোভানদের মুখাবয়ব সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনও ধারণা ছিল না। কারণ, প্রাচীন জীবাশ্মে সংরক্ষিত ডিএনএ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত থাকে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাবে হাজার হাজার বছর পরে ডিএনএ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া কঠিন। ফলে ডেনিসোভানদের শারীরিক গঠনের ছবি স্পষ্ট হচ্ছিল না।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা প্রোটিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ডিএনএ-র তুলনায় প্রোটিন অনেক বেশি সময় অক্ষত থাকতে পারে এবং তাতেও বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতেই নতুন দিশা খুলেছে গবেষণায়।

হারবিন শহরে ১৯৩৩ সালে পাওয়া ওই মানবখুলি দীর্ঘদিন পারিবারিক সংগ্রহে থাকায় বৈজ্ঞানিক গবেষণার বাইরে ছিল। ২০১৮ সালে প্রথমবার বিজ্ঞানীদের হাতে আসে খুলিটি। প্রায় ১ লক্ষ ৪৬ হাজার বছরের পুরোনো এই জীবাশ্মকে তখন ‘ড্রাগন ম্যান’ নামে চিহ্নিত করা হয়। আগে ধারণা ছিল, এটি হয়তো হোমো লঙ্গি নামে এক ভিন্ন বিলুপ্ত মানবপ্রজাতির।
কিন্তু বেজিংয়ের ‘ইনস্টিটিউট অফ ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি অ্যান্ড প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজি’-র গবেষক কিয়াওমেই ফু-র নেতৃত্বে একটি দল খুলিটির দাঁত থেকে সংগৃহীত মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ ও মোট ৯৫টি আদিম প্রোটিন বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, অন্তত তিনটি প্রোটিন এমন রয়েছে যা এখন পর্যন্ত কেবল ডেনিসোভানদের মধ্যেই পাওয়া গিয়েছে। এর ভিত্তিতেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, ‘ড্রাগন ম্যান’ আসলে ডেনিসোভানদেরই প্রতিনিধি।
এই গবেষণার ফলে ডেনিসোভানদের মুখাবয়ব সম্পর্কেও ধারণা মিলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, তাদের খুলি ছিল বেশ চওড়া, ভ্রু ছিল পুরু। গালের গঠন নিয়ান্ডারথালদের মতো অতটা রুক্ষ নয়, আবার আধুনিক মানুষের মতো সম্পূর্ণ কোমলও নয়—দু’য়ের মাঝামাঝি এক ধরনের বৈশিষ্ট্য ছিল ডেনিসোভানদের মুখে।

গবেষক দল এখন খুলিটির কানের ভেতরের হাড় থেকে সংগৃহীত নিউক্লিয়ার ডিএনএ বিশ্লেষণের কাজ চালাচ্ছেন। এর মাধ্যমে নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে ডেনিসোভানদের জিনগত সম্পর্ক, চোখের রঙ, এমনকি কোন কোন রোগের ঝুঁকি তাদের মধ্যে ছিল—সেসব বিষয়েও ভবিষ্যতে আরও তথ্য মিলতে পারে বলে আশা বিজ্ঞানীদের।
প্রায় দেড় দশক পরে ডেনিসোভানদের মুখের আদল স্পষ্ট হওয়ায় মানব বিবর্তনের ইতিহাসে যোগ হল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।