ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়ছে যুক্তরাজ্য !
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট | লন্ডন, ৭ জুন :
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদল অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান ধারার ব্যয়, ঋণ এবং ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশটি গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরেই যুক্তরাজ্যের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড অতিক্রম করতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি শুধু সংখ্যার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী সক্ষমতাকেও সীমিত করে দিতে পারে।
ঋণের পাহাড় কত বড়?
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের জাতীয় ঋণ ইতোমধ্যে দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় সমপর্যায়ে পৌঁছে গেছে। করোনা মহামারি, জ্বালানি সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কর্মসূচির কারণে গত কয়েক বছরে ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু ঋণের পরিমাণই নয়, ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন ও সামাজিক সেবার মতো খাতে নতুন বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কেন ২০৩০ সালকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল।
দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যার বয়স বাড়ছে, ফলে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয় বাড়ছে।
তৃতীয়ত, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ প্রয়োজন।
এই সব খাতের ব্যয় বাড়লেও কর আদায়ের হার একই গতিতে বাড়ছে না। ফলে সরকারের বাজেট ঘাটতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, যদি বড় ধরনের সংস্কার না আনা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ অর্থনীতি এমন এক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে সরকারকে জরুরি আর্থিক সহায়তার বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।
আইএমএফের সহায়তা মানে কী?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ সাধারণত সেই দেশগুলোর পাশে দাঁড়ায় যারা বৈদেশিক বা আর্থিক সংকটে পড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক দায়-দেনা সামাল দিতে হিমশিম খায়।
যদিও যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত অর্থনীতির দেশের জন্য আইএমএফের সহায়তা চাওয়া এখনো দূরবর্তী সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হয়, তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি আর পুরোপুরি অসম্ভব নয়।
ইতিহাস বলছে, ১৯৭৬ সালে যুক্তরাজ্য একবার আইএমএফের কাছ থেকে সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সময় দেশটি তীব্র মুদ্রা ও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে না পৌঁছালেও ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি অনেককে অতীতের সেই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সরকারের সামনে কী বিকল্প?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের হাতে কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্ত রয়েছে।
- সরকারি ব্যয় কমানো।
- কর বৃদ্ধি করা।
- উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
- কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
- দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ও কল্যাণ ব্যয় সংস্কার।
তবে এসব সিদ্ধান্তের প্রত্যেকটিরই রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। কর বাড়ালে ভোটার অসন্তুষ্টি বাড়তে পারে, আবার ব্যয় কমালে জনসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কী?
যদি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে কর বৃদ্ধি, সরকারি সেবা সীমিত হওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে গৃহঋণধারী পরিবারগুলোর ওপরও চাপ বাড়বে।
অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যকে আরও কঠিন আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
একসময় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল যুক্তরাজ্য। কিন্তু বর্তমানে দেশটি ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ ঋণ, বাড়তি সরকারি ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতার সংকটের মতো একাধিক সমস্যার সঙ্গে লড়ছে। জাতীয় ঋণ ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের কাছাকাছি পৌঁছানো শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ব্রিটিশ অর্থনীতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গভীর কাঠামোগত সমস্যারও প্রতীক। এখন প্রশ্ন হলো—নীতিনির্ধারকেরা সময় থাকতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করবেন, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার পর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন?