বাংলাদেশে ৪৫ লাখ মামলার জট, নিষ্পত্তিতে লেগে যেতে পারে কয়েক দশক

বাংলাদেশে ৪৫ লাখ মামলার জট, নিষ্পত্তিতে লেগে যেতে পারে কয়েক দশক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ২২ জুলাই:  দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন। এত বিপুল সংখ্যক মামলার কারণে বিচারব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান হারে মামলা নিষ্পত্তি এবং প্রতি বছর নতুন মামলা যুক্ত হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই মামলাজট কাটাতে কয়েক দশকও লেগে যেতে পারে

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা (প্রি-কেস মেডিয়েশন) কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে এ তথ্য তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

আইনমন্ত্রী বলেন, আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে আদালতের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০টি জেলায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মে সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে নতুন মামলা দায়ের গড়ে ৬২.০২ শতাংশ কমেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়

  • পারিবারিক আদালতের মামলা ৩,৫৫৯ থেকে কমে ১,৭৪৪টিতে নেমেছে (প্রায় ৫১% হ্রাস)।
  • বণ্টনসংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা ২,০০১ থেকে কমে ৬৬১টিতে নেমেছে (প্রায় ৬৭% হ্রাস)।
  • যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা ৫,৬০৫ থেকে কমে ১,৮১০টিতে নেমেছে।
  • পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনের মামলা ৪৩ থেকে কমে ৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
  • প্রিম্পশন ও নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনের মামলাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, এসব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর হলে নতুন মামলার প্রবাহ কমানো সম্ভব।

তবে বিচারব্যবস্থা সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৬০টির বেশি থানায় প্রতিদিন নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন পুরোনো ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত নতুন মামলাও যুক্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিচারক, আদালত ও অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ালে এবং মামলা নিষ্পত্তির গতি বহুগুণ বৃদ্ধি না পেলে বিদ্যমান মামলাজট দ্রুত কমানো কঠিন হবে।

আইনমন্ত্রী জানান, সরকার এখন বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইলে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু করেছে। আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী এসব জেলায় নির্দিষ্ট সাত ধরনের বিরোধ আদালতে নেওয়ার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার চেষ্টা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার জেলাতেই বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আগামী তিন মাসের মধ্যে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও ৪৫ লাখ মামলার জট কমাতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট, দ্রুত তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণে গতি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। শুধু নতুন মামলা কমালেই হবে না, পুরোনো মামলাগুলোর নিষ্পত্তির গতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।