ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

সিলেট সীমান্তের ১০০ রুটে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকের চোরাচালান: নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

সিলেট সীমান্তের ১০০ রুটে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকের চোরাচালান: নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

সিলেট প্রতিনিধি, ২২ জুলাই:

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সিলেট অঞ্চলে অস্ত্র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ও মাদকের চোরাচালান উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান ও গোয়েন্দা তথ্য বলছে, জেলার অন্তত পাঁচটি সীমান্তবর্তী উপজেলায় প্রায় ১০০টি অনুপ্রবেশ পথ ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র। এসব রুট দিয়ে শুধু মাদক নয়, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, ডেটোনেটর এবং পরে রূপান্তরযোগ্য এয়ারগানও দেশে প্রবেশ করছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে ধারাবাহিকভাবে অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার হওয়া কেবল চোরাচালানের বিষয় নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

অভিযানে মিলছে বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র

গত কয়েক মাসে র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশের একাধিক যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ২৭ জুন: জকিগঞ্জের সোনাসার এলাকায় ১১টি পাওয়ার জেল, ১১টি ডেটোনেটর ও একটি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার।
  • ২৫ জুন: বড়লেখা সীমান্ত থেকে ৩টি পিস্তল, ৩ কেজি পিস্তল ও ২৪টি ডেটোনেটর জব্দ।
  • ১৮ জুন: গোলাপগঞ্জে ৬টি পাওয়ার জেল, ৮টি ডেটোনেটর ও একটি ওয়ান শুটার গান উদ্ধার।
  • চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, তাহিরপুর ও দক্ষিণ সুরমাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক চালান আটক করা হয়।

র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে উদ্ধার হয়েছে—

  • প্রায় ৩৫ কেজি ৭৩০ গ্রাম উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক
  • ২২৪টি ডেটোনেটর
  • ৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র
  • ১০৪ রাউন্ড গুলি
  • ১৫৫টি এয়ারগান

তদন্তে উদ্ধার হওয়া অধিকাংশ বিস্ফোরক ও অস্ত্রের উৎস ভারত বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়েছে।

এয়ারগান বদলে হচ্ছে 'ওয়ান শুটার'

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সীমান্ত দিয়ে আনা সাধারণ এয়ারগান স্থানীয়ভাবে কারিগরি পরিবর্তনের মাধ্যমে 'ওয়ান শুটার' নামে পরিচিত প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক অভিযানে এমন কয়েকটি পরিবর্তিত অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে।

কোন কোন সীমান্ত বেশি ঝুঁকিতে?

জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ সীমান্তজুড়ে অসংখ্য অনুপ্রবেশ পথ সক্রিয় রয়েছে। এসব রুট দিয়ে মাদক, গরু, ভারতীয় পণ্য, চিনি, জিরা, প্রসাধনী সামগ্রীর পাশাপাশি অস্ত্র ও বিস্ফোরকও পাচার হচ্ছে বলে বিভিন্ন সংস্থার কাছে তথ্য রয়েছে।

কিছু সীমান্তপথ মানবপাচারের রুট হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত।

মূল হোতারা এখনও অধরা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে তারা মূলত বাহক। চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছে আন্তঃসীমান্ত সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক, যাদের অনেকেই এখনও আইনের আওতার বাইরে।

র‌্যাব-৯-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার মো. তাজমিনুর রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন, সীমান্তপারের মূল চক্র শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।

অন্যদিকে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মো. আবদুল জব্বার জলিল বলেছেন, শুধু বাহককে গ্রেপ্তার করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; মূল অর্থদাতা ও সংগঠকদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে টহল ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও বাড়ানো, আন্তঃদেশীয় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করা এবং চোরাচালানের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া ছাড়া এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

তাদের মতে, অস্ত্র ও বিস্ফোরকের চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এগুলো শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় নয়, দেশের অভ্যন্তরে সংগঠিত অপরাধ বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

ভয়েস অব পিপলের পর্যবেক্ষণ: সীমান্তে নিয়মিত চালান আটক হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার প্রমাণ হলেও, একই সঙ্গে এটি দেখায় যে চোরাচালান নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। কেবল চালান জব্দ নয়, এই অবৈধ বাণিজ্যের অর্থের উৎস, সংগঠক এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল শর্ত।