ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২১ ।। বিদায় বেলায় মেসি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২১ ।।  বিদায় বেলায় মেসি

।। বিদায় বেলায় মেসি ।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।

উৎসর্গ:

লিওনেল মেসিকে—যিনি শিখিয়েছেন, কখনো কখনো পরাজয়ের অশ্রুও বিজয়ের ট্রফির চেয়ে বেশি মহিমান্বিত

০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম আনন্দ আর বেদনার দুই রঙে বিভক্ত হয়ে গেল।

এক পাশে স্পেনের উল্লাস।

অন্য পাশে নিস্তব্ধ আর্জেন্টিনা।

আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝখানে একা বসে আছেন একজন মানুষ।

লিওনেল মেসি।

ধীরে ধীরে তিনি বুট খুললেন। মোজা খুললেন। কিন্তু বুকের ভেতরে জমে থাকা পাহাড়সম কষ্টটুকু খুলে রাখতে পারলেন না।

কয়েক মুহূর্ত আগেও তিনি ছিলেন কোটি মানুষের শেষ আশা। এখন তিনি শুধু একজন পরাজিত অধিনায়ক।

তবু পরাজয়েও তাঁর মাথা নত হলো না।

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে একে একে স্পেনের প্রতিটি খেলোয়াড়কে অভিনন্দন জানালেন। তারপর রানার্সআপের পদক গলায় ঝুলিয়ে যখন মঞ্চ থেকে নামছিলেন, পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে গর্জে উঠল—

"মেসি... মেসি... মেসি..."

সেই ডাক আর সহ্য করতে পারলেন না তিনি।

চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

এ কান্না নিজের জন্য নয়।

এ কান্না সেই আকাশি-সাদা জার্সির জন্য, যে জার্সি তিনি একুশ বছর ধরে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন।

মনে পড়ে গেল ২০১৪ সালের সেই হার, ২০১৬ সালের অবসর, আবার ফিরে আসা, ২০২১-এর কোপা আমেরিকা, ২০২২-এর বিশ্বকাপ, ফিনালিসিমা—সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।

তিনি ভেবেছিলেন, বিদায়ের আগে আরেকবার বিশ্বকাপটা দেশের মানুষকে উপহার দেবেন।

হলো না।

তবু মাঠ ছাড়ার সময় হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকের সঙ্গে তিনিও দেশের গান গাইলেন। চোখ ভেজা, কণ্ঠ ভারী—তবু ভালোবাসা অটুট।

সেদিন তাঁর হাতে বিশ্বকাপ ছিল না।

ছিল শুধু একটি জাতির অফুরন্ত ভালোবাসা।

দুদিন পর, পৃথিবী যখন তাঁর কান্নার ছবিই দেখছিল, তখন মেসি প্রথমবারের মতো নীরবতা ভাঙলেন।

দু‘দিন পর মুখ খুললেন সাংবাদিকদের কাছে—

"কষ্টটা অনেক বড়। এই ক্ষত সারতে সময় লাগবে। কিন্তু আমি শুধু হারের কথা মনে রাখতে চাই না। এই যাত্রার সুন্দর স্মৃতিগুলোও বুকে রাখতে চাই। একটি পুরো দেশের ভালোবাসা আর আমার সতীর্থদের অবিশ্বাস্য পরিশ্রমের জন্য আমরা আবারও বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটি হতে পেরেছি।"

এরপর তিনি লিখলেন এমন কিছু, যা পড়ে কোটি সমর্থকের চোখ আবার ভিজে উঠল।

"আজ হয়তো আমরা বুঝতে পারছি না, আমরা কী অর্জন করেছি। প্রতিটি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসার জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা। আর নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে অভিনন্দন।"

যে মানুষটি কয়েক ঘণ্টা আগেও চোখের জল লুকাতে পারেননি, সেই মানুষটিই নিজের বেদনার মাঝেও প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানাতে ভুললেন না।

এটাই হয়তো প্রকৃত মহত্ত্ব।

ঊনচল্লিশ বছরের সেই মানুষটি জানতেন, হয়তো এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ।

হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ বিশ্বকাপের ম্যাচও।

তবু বিদায়বেলায় তিনি অভিযোগ করেননি।

দোষারোপ করেননি কাউকে।

শুধু নিজের দেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

ফুটবল তাঁকে শেষ বিশ্বকাপে ট্রফি দিতে পারেনি।

কিন্তু মানুষ তাঁকে দিয়েছে আরও বড় একটি সম্মান—অসীম ভালোবাসা।

হয়তো ইতিহাস লিখবে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন।

কিন্তু মানুষের হৃদয় মনে রাখবে অন্য একটি দৃশ্য—

মাঠের মাঝখানে একা বসে থাকা একজন কিংবদন্তিকে।

যার চোখে জল ছিল পরাজয়ের নয়, ছিল নিজের দেশকে আরেকবার হাসাতে না পারার গভীর কষ্ট।

আর সেই কারণেই লিওনেল মেসি শুধু সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার নন।

তিনি প্রমাণ করে গেলেন—কিংবদন্তির পরিচয় ট্রফিতে নয়, চরিত্রে; জয়ে নয়, বিদায়ের মুহূর্তেও ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতায়।

লন্ডন, ২২ জুলাই ২০২৬