লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: টানা চতুর্থবার মেয়র লুৎফুর রহমান
লন্ডন, ৮ মে: যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বরোতে আবারও বিপুল ব্যবধানে জয় পেলেন লুৎফুর রহমান। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৩৫,৬৭৯ ভোট পেয়ে এক্সিকিউটিভ মেয়র হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন।
উচ্চ ভোটার উপস্থিতির এই নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে লেবার পার্টি। তাদের প্রার্থী পান ১৯,৪৫৪ ভোট, যা গ্রিন পার্টির প্রার্থীর (১৯,২২৩ ভোট) চেয়ে মাত্র ২৩১ ভোট বেশি। ফলে লেবার কার্যত তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়ার অবস্থায় পড়ে।

টানা চার মেয়াদে ইতিহাস
২০১০ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম বর্ণসংখ্যালঘু নির্বাহী মেয়র হিসেবে নজির গড়েন লুৎফুর রহমান। এরপর ২০১৪, ২০২২ এবং এবার ২০২৬ সালে—টানা চতুর্থবার তিনি এই পদে নির্বাচিত হলেন।
২০২২ সালেই তার দল অ্যাসপায়ার লন্ডনের কোনো বরোতে প্রথমবারের মতো লেবার, কনজারভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের বাইরে গিয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাস গড়ে।
প্রচারণায় রাজনৈতিক সমর্থন ও বিতর্ক
নির্বাচনী প্রচারণায় সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিন লুৎফুর রহমানকে সমর্থন জানান। প্রচারণা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটস একটি “রূপান্তরমূলক স্থানীয় প্রশাসনের উদাহরণ” হয়ে উঠেছে।
লন্ডন স্ট্যান্ডার্ডে লেখা এক নিবন্ধে তিনি অন্যান্য কাউন্সিলকে টাওয়ার হ্যামলেটসের মডেল অনুসরণ করার আহ্বান জানান।
বিজয়ের পর কড়া রাজনৈতিক বার্তা
বিজয়ের পর লুৎফুর রহমান বলেন, ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থার উত্থানের প্রেক্ষাপটে টাওয়ার হ্যামলেটস আবারও দেখিয়েছে—মানুষ বিভেদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি বলেন, “মানুষ ভয় ও বিভেদের রাজনীতি নয়, আশার রাজনীতি বেছে নিয়েছে।”
তার অভিযোগ, নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত ও বিভেদমূলক প্রচারণা চালানো হয়েছে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও ছড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। তিনি আরও দাবি করেন, একজন সাবেক টোরি এমপি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে তার বিরুদ্ধে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
নীতিগত প্রতিশ্রুতি ও সামাজিক কর্মসূচি
লুৎফুর রহমান তার প্রশাসনের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন—সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু, বাতিল হওয়া Education Maintenance Allowance (EMA) পুনর্বহাল এবং শীতকালীন জ্বালানি সহায়তা ফিরিয়ে আনা।
নতুন মেয়াদে তার সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতি হলো নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ট্রাভেল পাস চালু করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা টিউব, ওভারগ্রাউন্ড ও বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত সুবিধা পাবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে টাওয়ার হ্যামলেটস হবে যুক্তরাজ্যের প্রথম স্থানীয় প্রশাসন যারা এমন ব্যবস্থা চালু করবে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই ফলাফলকে অনেকে শুধু স্থানীয় বিজয় হিসেবে দেখছেন না, বরং লন্ডনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিতে এই পতন এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, লুৎফুর রহমানের সমর্থকরা মনে করছেন—এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং লন্ডনের বৈচিত্র্যময় জনপদের নতুন রাজনৈতিক বার্তা।