এআইয়ের বিরুদ্ধে লেখকদের নীরব বিদ্রোহ
‘ফাঁকা বই’ হাতে লন্ডন বইমেলায় ১০ হাজার লেখকের প্রতিবাদ
লন্ডন, ৭ মে:
লন্ডনে এবার বইমেলার এক কোণে দেখা গেল এক অদ্ভুত বই। প্রচ্ছদ আছে, নাম আছে, লেখকদের তালিকাও আছে—কিন্তু ভেতরে কোনো লেখা নেই। একেবারে সাদা পৃষ্ঠা। আর সেই নীরব শূন্যতাই যেন আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—মানুষের সৃজনশীলতা কি ধীরে ধীরে যন্ত্রের খাদ্যে পরিণত হচ্ছে?
‘ডোন্ট স্টিল দিস বুক’ নামের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার লেখক। তাঁদের অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিষ্ঠানগুলো লেখকদের বই, প্রবন্ধ ও সৃজনশীল কাজ অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করছে নিজেদের মডেল প্রশিক্ষণের জন্য। অথচ লেখকদের দেয়া হচ্ছে না কোনো পারিশ্রমিক, এমনকি নেয়া হচ্ছে না অনুমতিও।
এই প্রতিবাদে নাম লিখিয়েছেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক Kazuo Ishiguro, জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক Philippa Gregory, Richard Osman, ‘স্লো হর্সেস’-এর লেখক Mick Herron, লেখক Marian Keyes, ইতিহাসবিদ David Olusoga এবং ‘নটস অ্যান্ড ক্রসেস’ সিরিজের লেখক Malorie Blackman।
লেখকদের এই কর্মসূচির অন্যতম সংগঠক সুরকার ও কপিরাইট আন্দোলনকর্মী Ed Newton-Rex বলেন, বর্তমান এআই শিল্প অনেকাংশেই দাঁড়িয়ে আছে “চুরি করা সৃজনশীল কাজের” ওপর। তাঁর ভাষায়, লেখকদের অনুমতি ছাড়াই তাদের সৃষ্টি ব্যবহার করে এমন প্রযুক্তি তৈরি করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে সেই লেখকদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নামছে।
এ অভিযোগ শুধু আবেগের নয়, অর্থনীতিরও। কারণ বহু লেখক, শিল্পী ও স্রষ্টার জীবিকা নির্ভর করে তাঁদের মৌলিক কাজের ওপর। কিন্তু যদি সেই কাজই বিনা অনুমতিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ডাটাবেজে ঢুকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে সৃষ্টিশীল মানুষের মূল্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠছে।
লেখক মালোরি ব্ল্যাকম্যান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো এআই কোম্পানি যদি লেখকদের বই ব্যবহার করে, তবে তার জন্য লেখকদের ন্যায্য সম্মানি দেয়া উচিত। কারণ সৃজনশীল শ্রমেরও মূল্য আছে।
এদিকে বিতর্কের মাঝেই লন্ডন বইমেলায় প্রকাশনা খাত থেকে নতুন একটি লাইসেন্স ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা এসেছে। প্রকাশকদের লাইসেন্সিং সেবা নামে একটি অলাভজনক সংস্থা জানিয়েছে, তারা এমন একটি বৈধ কাঠামো তৈরি করতে চায়, যার মাধ্যমে এআই কোম্পানিগুলো বই ব্যবহারের আগে আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিতে বাধ্য হবে।
প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, ততই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের সৃষ্টিকে সম্মান করবে, নাকি মানুষের সৃষ্টিকেই একদিন মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে—সেই বিতর্ক এখন সাহিত্য জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে। আর সেই প্রশ্নের জবাব দিতেই হয়তো হাজারো লেখক এবার শব্দের বদলে প্রকাশ করলেন নীরবতা।