শরৎচন্দ্র: সহজতার শক্তি, গণমানুষের ভাষা
ভয়েস অব পিপল সাহিত্য ডেস্ক ।। সহজ, সাবলীল, স্বতঃস্ফূর্ত—শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখাকে বর্ণনা করতে এই ক’টি শব্দই যথেষ্ট। অথচ এই সহজতাকেই অনেক সময় তার দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ, সাহিত্যে জটিলতা, গাম্ভীর্য আর গ্রন্থিলতাকেই দীর্ঘদিন ‘আধুনিকতা’র মানদণ্ড ধরা হয়েছে। সেই চোখে শরৎচন্দ্রকে কেউ কেউ দেখেছেন অনাবশ্যক এক সেতু হিসেবে—বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের পর, যেন তাকে এড়িয়ে গেলেই বিভূতি-তারাশঙ্কর-মানিকদের কাছে পৌঁছনো যায়।
কিন্তু ইতিহাস উল্টো কথাই বলে। শরৎচন্দ্র না থাকলে এই লেখকরা এত দ্রুত, কিংবা রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতেই, নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পেতেন কি না—সে প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে শরৎচন্দ্রই তাকে বেশি উজ্জীবিত করেছিলেন। কারণ শরৎচন্দ্র গল্প বলেছিলেন মানুষের কথা, সাধারণ মানুষের—গ্রামের দরিদ্র, লাঞ্ছিত, অবহেলিত মানুষের। বঙ্কিমের রোমান্টিকতা আর রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক উচ্চতা থেকে নেমে এসে তিনি সাহিত্যকে মাটিতে দাঁড় করিয়েছিলেন।
শরৎচন্দ্রের শিল্প হয়তো নান্দনিকভাবে ‘অসম্পূর্ণ’ ছিল—এই অভিযোগ অমূলক নয়। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতাই পথ খুলে দিয়েছিল পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। কালি-কলম, কল্লোল গোষ্ঠী, এমনকি জগদীশ গুপ্ত বা রমানাথ রায়ের মতো ভিন্ন মেরুর লেখকরাও ভেতরে ভেতরে শরৎচন্দ্রের ঋণ স্বীকার করেছেন। কারণ তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন—সহজ ভাষায় গভীর আর্তি ধরা যায়।
তাঁর গল্পগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট। মহেশ, বিলাসী, মেজদিদি কিংবা অভাগীর স্বর্গ—এই সরল গল্পগুলোর ভেতরে যে মানবিক বেদনা, তা কোনো অলংকারে তৈরি নয়; তা আসে জীবনের গভীর থেকে। প্রাচীন স্থাপনার মতোই এসব গল্প টিকে আছে তাদের ভেতরকার শক্তির জোরে, বাহ্যিক যত্ন ছাড়াও।
শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ—তিনি সাহিত্যকে ‘হাটে নামিয়ে’ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিল্প যদি মানুষের বুকে ব্যথা জাগায়, যদি মানবিক বেদনাকে অনুভবযোগ্য করে তোলে, তবে সেই সহজতায় দোষ কোথায়? দস্তয়েভস্কির মতো লেখকরাও তো আবেগের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তবু তাদের আধুনিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি।
আসলে শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের আভিজাত্যের দেয়াল ভেঙে দিয়েছিলেন। সাহিত্য যে শুধু উচ্চশিক্ষিত, অভিজাতদের একচেটিয়া ক্ষেত্র—এই ধারণা ভাঙার মধ্য দিয়েই তিনি এক ধরনের বিপ্লব ঘটান। সাহিত্যকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সাহস দেখান, আর সেই সাহস উত্তরাধিকার হয়ে যায় নজরুল থেকে মানিক, সমরেশ বসু পর্যন্ত।
গদ্যের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা মৌলিক। সাধু ভাষায় লিখেও তিনি গদ্যের মেজাজকে করে তুলেছিলেন চলিত, প্রাণবন্ত। আকাশ থেকে নামিয়ে এনেছিলেন মাটিতে। এই মাটিবর্তী গদ্যই পরবর্তী বাংলা কথাসাহিত্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
আজও ভারতজুড়ে নানা ভাষায় অনূদিত শরৎচন্দ্র, তার গল্পে নির্মিত চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা—সবই বলে দেয়, তিনি কেবল এক সময়ের লেখক নন। ‘অমর কথাশিল্পী’ অভিধা হয়তো আজ কম শোনা যায়, কিন্তু অভিধা মুছে গেলেও সাহিত্য টিকে থাকে।
নতুন বয়ানে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা যেতেই পারে। কিন্তু তাদের লেখার ভেতরকার শক্তি মুছে ফেলা যায় না। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জীবনের সঙ্গে শরৎচন্দ্র অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে আছেন—সহজতার শক্তি নিয়ে, গণমানুষের ভাষা হয়ে।