নাট্যাঙ্গনের প্রজ্ঞাবান অভিভাবক আতাউর রহমান আর নেই

নাট্যাঙ্গনের প্রজ্ঞাবান অভিভাবক আতাউর রহমান আর নেই

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ১১ মে:  বাংলাদেশের নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক আতাউর রহমান আর নেই। সোমবার মধ্যরাতে রাজধানীর ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। আতাউর রহমান এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

অভিনেতা রওনক হাসান তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী ও সহশিল্পীরা হাসপাতালে ভিড় করতে থাকেন।

পরিবার ও সহকর্মী সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার বাসায় পড়ে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন আতাউর রহমান। প্রথমে তাঁকে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউ সুবিধা না পাওয়ায় পরে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল। এক পর্যায়ে কিছুটা উন্নতি হলে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়, তবে আবার অবস্থার অবনতি হলে রোববার পুনরায় তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালী অঞ্চলের ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন আতাউর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও তাঁর জীবনের প্রকৃত সাধনা ছিল নাটক ও সংস্কৃতিচর্চা। ষাটের দশক থেকেই তিনি মঞ্চনাটকের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যআন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক ও সংগঠক—প্রতিটি পরিচয়েই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। স্বাধীনতা-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে যাঁরা নিরলস কাজ করেছেন, তাঁদের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। তাঁর নাটক ও নির্দেশনায় উঠে এসেছে সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক সংকট, রাজনৈতিক অভিঘাত এবং মধ্যবিত্ত জীবনের নানা টানাপোড়েন।

মঞ্চে তাঁর অভিনয় ছিল সংযত অথচ গভীর ব্যঞ্জনাময়। সংলাপ উচ্চারণ, চরিত্র বিশ্লেষণ ও অভিনয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির কারণে তিনি নাট্যাঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণালি সময়েও তিনি ছিলেন দর্শকপ্রিয় এক মুখ। তাঁর অভিনীত বহু নাটক এখনও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

নাট্যসংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি বাংলাদেশ সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (BCITI)-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশীয় নাট্যচর্চাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকাশেও তিনি আজীবন সক্রিয় ছিলেন।

সাহিত্যচর্চায়ও ছিল তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থান। ‘ষষ্ঠী তৎপুরুষ’, ‘দুই দুগুণে পাঁচ’ ও ‘মধ্যরাতের জোকস’-এর মতো গ্রন্থে সমাজ পর্যবেক্ষণ, ব্যঙ্গরস ও চিন্তার গভীরতা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নাটক ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এই গুণী মানুষটি।

আতাউর রহমানের মৃত্যুতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন হারাল এক প্রজ্ঞাবান অভিভাবককে। তাঁর কর্ম, দর্শন ও সৃষ্টিশীলতা আগামী প্রজন্মের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।