আজ সকাল সাড়ে নয়টায় নির্ধারণ হতে পারে স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট | লন্ডন | ১২ মে ২০২৬
ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেটির ভিতরে বিদ্রোহ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের পদত্যাগ এখন শুধু গুঞ্জন নয়, বরং ওয়েস্টমিনস্টারের কেন্দ্রীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১২ মে) সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে পুরো মন্ত্রিসভা বৈঠকে বসছে। স্থানীয় নির্বাচনের পর এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ ক্যাবিনেট সভা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, এই বৈঠকেই স্টারমারের সামনে সরাসরি পদত্যাগের প্রশ্ন উঠতে পারে। এমনকি তাকে সরে দাঁড়ানোর সময়সূচি ঘোষণার চাপও দেওয়া হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। ওয়েস্টমিনস্টারে এখন কার্যত “শেষ লড়াইয়ের” আবহ তৈরি হয়েছে।

মূলত, স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের ভয়াবহ ভরাডুবির পর স্টারমারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে তার মন্ত্রিসভার অন্তত তিনজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে তাকে “নিজের অবস্থান বিবেচনা” করার পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। ব্রিটিশ রাজনৈতিক মহলে এটিকে স্টারমারের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ কয়েক মাস ধরেই জমছিল। তবে গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচন পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। লেবার প্রায় ১,৪০০ কাউন্সিলর হারিয়েছে। ইংল্যান্ডের বহু গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি ওয়েলসেও বড় ধাক্কা খেয়েছে দলটি। স্কটল্যান্ডে আবারও Scottish National Party শক্ত অবস্থান ধরে রাখায় লেবারের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর স্টারমার সোমবার লন্ডনে একটি “রিসেট স্পিচ” দেন। তিনি সেখানে ব্রিটিশ স্টিল জাতীয়করণ, যুব বেকারত্ব মোকাবিলা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, “খণ্ড খণ্ড পরিবর্তনে আর কাজ হবে না, বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।”
কিন্তু সেই বক্তব্য উল্টো তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ ব্রেক্সিটপন্থী লেবার এমপিরা মনে করছেন, সাধারণ ভোটারদের বাস্তব সমস্যার বদলে স্টারমার আবারও ইউরোপকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ফিরে গেছেন।
লেবার এমপি Jonathan Hinder বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “এখন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে। তিনি যাচ্ছেন—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।” স্টারমারের বক্তব্যকে তিনি “টোন ডেফ” এবং “অপমানজনক” বলেও মন্তব্য করেন।
দলীয় বিদ্রোহের মাত্রা বোঝা যায় আরেকটি ঘটনায়। স্টারমারের পদত্যাগ দাবিতে ইতোমধ্যে ৮০ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা ক্যাথরিন ওয়েস্টের পাঠানো এক চিঠিতে স্বাক্ষরও করেছেন, যেখানে স্যার কিয়ার স্টারমারকে এই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, ছয়জন পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি—যারা মূলত মন্ত্রীদের রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে কাজ করেন—সরকার থেকে পদত্যাগ করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
ডাউনিং স্ট্রিট দ্রুত নতুন অনুগত এমপিদের দিয়ে সেই শূন্যপদ পূরণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে সংকট কমার বদলে বরং আরও স্পষ্ট হয়েছে যে সরকার ভেতর থেকেই কাঁপছে।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী Wes Streeting-কে ঘিরেও নতুন জল্পনা তৈরি হয়েছে। টেলিগ্রাফ দাবি করেছে, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হলে তিনি প্রার্থী হতে প্রস্তুত। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন এমপি স্টারমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে ধারণা জন্মেছে যে লেবারের ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। যদিও স্ট্রিটিং প্রকাশ্যে “অভ্যুত্থানের” অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সংকট আরও গভীর হয়েছে কারণ বুধবারই সরকারের নতুন আইন প্রণয়ন পরিকল্পনা নিয়ে রাজার ভাষণ হওয়ার কথা। কিন্তু যদি বিদ্রোহী এমপিরা ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই কর্মসূচিও পার্লামেন্টে বাধার মুখে পড়তে পারে। এতে সরকার কার্যত পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন বিরোধী দল নয়, বরং নিজের দল। নির্বাচনী ব্যর্থতা, নীতিগত দ্বিধা, ব্রেক্সিট প্রশ্নে বিভক্ত অবস্থান এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে লেবার পার্টি এমন এক সংকটে পড়েছে, যা ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের পথ খুলে দিতে পারে।
লন্ডনের রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—স্টারমার কি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবেন, নাকি লেবার পার্টি আরেকটি নাটকীয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে?