সাবেক আইজিপি বেনজিরের নজিরবিহীন আমলনামা

সাবেক আইজিপি বেনজিরের নজিরবিহীন আমলনামা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৬ জুন: 

একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা এখন নিজেই নানা অভিযোগ, মামলা ও আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জমি দখল, পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং বিতর্কিত শিক্ষাগত যোগ্যতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তার কর্মজীবনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন বিতর্কের ইতিহাস।

সম্প্রতি দুবাই পলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য প্রকাশের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা অধ্যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বিস্তৃত অভিযোগ আগে খুব কমই দেখা গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে অভিযুক্তের কাঠগড়ায়

পুলিশের একজন কর্মকর্তা হিসেবে বেনজির আহমেদের উত্থান ছিল দ্রুত। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, র‍্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদেই তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তবে সরকারের পরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে।

দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত শুরু হলে আদালতের নির্দেশে তার এবং পরিবারের সদস্যদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতাও চাওয়া হয়।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ সংশ্লিষ্ট। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে তার নাম এসেছে। এসব অভিযোগ এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিল যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কিছু অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং গুমের ঘটনা ঘটেছে। সেই বিতর্কে বেনজির আহমেদের নাম বারবার সামনে এসেছে।

সম্পদের পাহাড় ও জমি নিয়ে বিতর্ক

দুর্নীতি অনুসন্ধানে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য উঠে আসে। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, রিসোর্ট এবং শত শত বিঘা জমির মালিকানার তথ্য তদন্ত সংস্থার নজরে আসে।

বিশেষ করে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অনেক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের চূড়ান্ত বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি।

‘ডক্টর’ পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন

শুধু সম্পদ নয়, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একটি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই ডিগ্রি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পাসপোর্ট নিয়ে বিশেষ সুবিধার অভিযোগ

আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়ন সংক্রান্ত অভিযোগ। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় অন্য পরিচয়ে পাসপোর্ট গ্রহণ এবং নিয়মবহির্ভূত সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তদন্তে এসব বিষয়ে নানা তথ্য সামনে আসে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা

র‍্যাবের সাবেক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায়ও আসেন তিনি। বাংলাদেশের কোনো উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

অর্থ পাচারের অভিযোগ

দুর্নীতি দমন সংস্থার তদন্তে তার এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও আনা হয়। কয়েক কোটি টাকার লেনদেন ও বিনিয়োগের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্তকারীদের দাবি, কিছু অর্থের বৈধ উৎসের তথ্য পাওয়া যায়নি।

একটি যুগের প্রতীকী চরিত্র

বেনজির আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এত বিপুল ও বহুমাত্রিক অভিযোগ বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিরল।

একসময় যিনি ছিলেন ক্ষমতার প্রতীক, আজ তিনি পরিণত হয়েছেন জবাবদিহিতার এক বড় পরীক্ষার নাম। আর সেই কারণেই অনেকের কাছে বেনজির আহমেদের কর্মজীবন হয়ে উঠেছে—“নজিরবিহীন এক আমলনামা”।