ব্রিটেন সংবাদ

অভিবাসন নিয়ে বদলাচ্ছে ব্রিটিশ জনমত : উদ্বেগ বাড়লেও পুরো সমাজ অভিবাসনবিরোধী নয়

অভিবাসন নিয়ে বদলাচ্ছে ব্রিটিশ জনমত : উদ্বেগ বাড়লেও পুরো সমাজ অভিবাসনবিরোধী নয়

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৫ সেপ্টেম্বর :

ব্রিটেনে অভিবাসন নিয়ে জনমত আবারও কঠোর হওয়ার দিকে যাচ্ছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Migration Observatory-এর নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৩ সালের পর থেকে এক দশকের মতো সময় ধরে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব কমলেও ২০২২ সালের পর সেই প্রবণতা ঘুরে গেছে। একই সঙ্গে অভিবাসন এখন ব্রিটিশ জনগণের কাছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

জুলাই ২০২৬-এর জরিপে ৪৩ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক বলেছেন, অভিবাসন যুক্তরাজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যা। গবেষণায় এটিই ওই সময়ের সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, “অভিবাসন” বলতে মানুষ কী বোঝাচ্ছে এবং প্রশ্নটি কীভাবে করা হচ্ছে—তার ওপর জনমতের ফল উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যায়।

অভিবাসন বেশি মনে হলেও সবাই এটিকে ক্ষতিকর মনে করেন না

YouGov-এর ২০২৬ সালের পৃথক জরিপেও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত ১০ বছরে যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের মাত্রা খুব বেশি বা বেশি হয়েছে বলে ৬৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন। ২০১৬ সালে একই প্রশ্নে এই হার ছিল ৭০ শতাংশ—অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে খুব বড় পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু অভিবাসনের প্রভাব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন বেশি স্পষ্ট। বর্তমানে ৪৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন গত এক দশকের অভিবাসন ব্রিটেনের জন্য মূলত খারাপ হয়েছে। ২০১৬ সালে এই হার ছিল ৩৩ শতাংশ। বিপরীতে ২১ শতাংশ মনে করেন অভিবাসন মূলত ভালো হয়েছে এবং ২৯ শতাংশের মত, এটি ভালো ও খারাপ—দুই ধরনের প্রভাবই ফেলেছে।

অর্থাৎ ব্রিটিশ জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—অনেকে অভিবাসনের মাত্রা কমাতে চান, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা ব্রিটেনে বসবাসরত সব অভিবাসী বা অভিবাসনকে ক্ষতিকর মনে করেন।

বৈধ অভিবাসন ও ছোট নৌকার অভিবাসনে বড় পার্থক্য

অক্সফোর্ডের গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি হলো, ব্রিটিশ জনগণ সব ধরনের অভিবাসীকে একইভাবে দেখেন না।

গবেষণায় দেখা গেছে, বৈধভাবে আসা অভিবাসী শ্রমিক, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং বৈধভাবে প্রবেশ করা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

কিন্তু ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় আসা আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের সম্পর্কে ৭২ শতাংশ মানুষের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

এতে বোঝা যায়, ব্রিটিশ জনগণের অভিবাসন-উদ্বেগের একটি বড় অংশ আসলে অভিবাসনের ধরন, প্রবেশের পদ্ধতি এবং নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত

দক্ষতা ও অপরাধের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ

অর্থনৈতিক অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ জনগণ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অপরাধের ইতিহাসকে। ৯৪ শতাংশ বলেছেন, গুরুতর বা সহিংস অপরাধের রেকর্ড বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট বা অহিংস অপরাধের ক্ষেত্রেও ৮৯ শতাংশ এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

এ ছাড়া ৮৬ শতাংশ ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং প্রায় ৮৭ শতাংশ যুক্তরাজ্যে যেসব দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, সেই দক্ষতা থাকাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

অর্থাৎ জনমতের বড় একটি অংশের কাছে প্রশ্নটি শুধু “অভিবাসী আসবে কি না”—এমন নয়; বরং কে আসছে, কী দক্ষতা নিয়ে আসছে, আইন মানছে কি না এবং ব্রিটিশ অর্থনীতিতে কী অবদান রাখবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণ ও শিক্ষিতদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলক ইতিবাচক

Oxford-এর গবেষণায় আরও দেখা গেছে, তরুণ মানুষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অভিবাসন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে Conservative ও Reform UK-কে ভোট দেওয়া মানুষের মধ্যে অভিবাসন নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বেশি এবং তাঁরা বিষয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

তবে দলীয় বিভাজনের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। YouGov-এর জরিপ অনুযায়ী, অভিবাসনের মাত্রা বেশি বলে মনে করেন ৫৩ শতাংশ Labour ভোটার এবং ৫৬ শতাংশ Liberal Democrat ভোটারও। Conservative ভোটারদের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশ এবং Reform UK ভোটারদের ক্ষেত্রে ৯৮ শতাংশ।

কোন দেশের অভিবাসীদের নিয়ে মনোভাব বদলেছে

অভিবাসীদের জাতীয়তার ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ জনমতের পার্থক্য স্পষ্ট। YouGov-এর জরিপে দেখা যায়, পাকিস্তান থেকে অভিবাসন কমানো বা বন্ধ করার পক্ষে ৫২ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে ৪৮ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই হার সর্বোচ্চ—৫৮ শতাংশ।

অন্যদিকে পোলিশ অভিবাসীদের প্রতি মনোভাব গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে ইতিবাচক হয়েছে। বর্তমানে ৫৩ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক পোল্যান্ড থেকে বর্তমান সংখ্যক বা আরও বেশি অভিবাসী আসার পক্ষে। ২০১৬ সালের তুলনায় পোলিশ অভিবাসন কমানোর পক্ষে মত দেওয়া মানুষের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ

Oxford-এর গবেষণা বলছে, ২০১৩ থেকে ২০২০-এর শুরুর দিক পর্যন্ত ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব কমেছিল। কিন্তু ২০২২ সালের পর আবার তা বাড়ছে। একই সময়ে অভিবাসন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।

এর অর্থ হলো, ব্রিটেনে এখন অভিবাসন নিয়ে জনমতকে শুধু “অভিবাসনপন্থী” ও “অভিবাসনবিরোধী”—এই দুই ভাগে দেখা ঠিক হবে না। জনমতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত, দক্ষতা-ভিত্তিক ও আইনসম্মত অভিবাসনকে ছোট নৌকায় অনিয়মিত প্রবেশের সঙ্গে এক করে দেখছে না।

এই পার্থক্যটি ব্রিটিশ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যত তীব্র হচ্ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—সরকার কি মোট অভিবাসন কমাবে, নাকি কোন ধরনের অভিবাসন প্রয়োজন এবং কোন ধরনের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, সেই পার্থক্যকে নীতির কেন্দ্রে রাখবে?