দেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন

১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর: সড়কে একের পর এক মৃত্যু, কোথায় কে নিহত ও আহত

১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর: সড়কে একের পর এক মৃত্যু, কোথায় কে নিহত ও আহত

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :

বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার এই সংকলন তৈরি করা হয়েছে। একই দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে দুর্ঘটনার ঘটনার তারিখ অনুযায়ী নিহত ও আহতদের তথ্য সাজানো হয়েছে। 

এই তালিকাটি সারাদেশের সরকারি পূর্ণাঙ্গ দুর্ঘটনা-পরিসংখ্যান নয়; সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা ঘটনাগুলোর সংকলন। অনেক দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে আহতের মোট সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে।

১ সেপ্টেম্বর

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এলাকায় কর্তব্যরত অবস্থায় বিমানবাহিনীর একটি কিউআরএফ জিপ দুর্ঘটনায় তিন সদস্য নিহত ও চারজন গুরুতর আহত হন। একই দিনে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে দুই মোটরসাইকেল আরোহী, নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় সিএনজিচালক ওয়াজিদ মিয়া ও যাত্রী লিজা আক্তার এবং খুলনার খালিশপুরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় হামিদ খান্ডাকার নিহত হন। কেন্দুয়ার দুর্ঘটনায় আরও তিনজন আহত হন।

১ সেপ্টেম্বর, নিহত ৮, আহত ৭।

২ সেপ্টেম্বর

টাঙ্গাইলের সখীপুরে মোটরসাইকেল আরোহী আওয়াল শফি ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন। ফরিদপুরের নগরকান্দায় বাস ও সারবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। শরীয়তপুরে রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসের ধাক্কায় রতন পোদ্দার নিহত হন। ময়মনসিংহের আলালপুরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও অন্তত আটজন আহত হন।

২ সেপ্টেম্বর, নিহত ৫, আহত অন্তত ২৮।

৩ সেপ্টেম্বর

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ও সুন্দরগঞ্জ এলাকায় পৃথক দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসচালক মাসুদ রানা ও মোটরসাইকেল আরোহী গোলাম রব্বানী নিহত হন। এসব ঘটনায় আরও দুজন আহত হন।

৩ সেপ্টেম্বর, নিহত ২, আহত ২।

৪ সেপ্টেম্বর

ফেনীতে পৃথক দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও অন্তত সাতজন আহত হন। যশোরে পৃথক তিনজন নিহত হন। কুষ্টিয়ার মিরপুরে সাবেক প্রধান শিক্ষক আবদুল লতিফ মালিথা নিহত হন। মাদারীপুরে শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে পুলিশের একটি পিকআপ উল্টে পুলিশ সদস্য আবদুস সালাম নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হন।

এ দিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

৪ সেপ্টেম্বর, নিহত ১০, আহত অন্তত ১৭।

৫ সেপ্টেম্বর

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সিএনজি অটোরিকশা ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে অন্তত দুইজন নিহত ও তিনজন আহত হন। তবে প্রথম আলোর পরবর্তী প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা তিনে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে—অর্থাৎ চিকিৎসাধীন আরও একজন পরে মারা যান।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পৃথক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলচালক আবদুর রহমান ও পথচারী আবুল হাসেম নিহত হন। একই দিনে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ইশাত আহমেদ নামে ১৮ বছরের এক তরুণের মৃত্যু হয়।

৫ সেপ্টেম্বর, নিহত ৫, আহত অন্তত ৩।

৬ সেপ্টেম্বর

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে তিনজন নিহত হন। আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১২, ১৫, ২০ ও ৩০ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন তথ্য এসেছে; তাই এখানে সতর্কতার সঙ্গে ২০ জনকে গণনায় ধরা হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রামের রাউজানে ইটবোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় নুরুল ইসলাম টিটু নিহত হন।

৬ সেপ্টেম্বর, নিহত ৪, আহত অন্তত ২০।

৭ সেপ্টেম্বর

ফেনীর লালপোলে বাস উল্টে কাস্টমস কর্মকর্তা আবদুল আলিম নিহত হন। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হন। একই সময়ে ফেনীতে পৃথক দুর্ঘটনায় এক স্কুলছাত্র নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।

৭ সেপ্টেম্বর, নিহত ২, আহত অন্তত ১০।

৮ সেপ্টেম্বর

কুমিল্লার দাউদকান্দিতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাস খাদে পড়ে ২৪ শিক্ষার্থী আহত হন। দিনাজপুরের বিরামপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় রুমি আক্তার নিহত এবং তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান আহত হন। ময়মনসিংহের ত্রিশালে পৃথক দুর্ঘটনায় মার্জিয়া খাতুন ও শাহিদুল ইসলাম নিহত হন। এছাড়া চলন্ত বাসের নিচে চাপা পড়ে মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হন।

নেত্রকোনার পূর্বধলায় মোটরসাইকেলচালক গণেশ চন্দ্র সরকার নিহত এবং অটোরিকশাচালক শামসু শেখ গুরুতর আহত হন।

৮ সেপ্টেম্বর, নিহত ৬, আহত অন্তত ২৮।

৯ সেপ্টেম্বর

পঞ্চগড়ে দাদার অটোভ্যান সরানোর সময় চাপা পড়ে দুই বছরের শিশু সায়ান নিহত হয়। পাবনার ঈশ্বরদীতে ছেলের বিয়ের বাজার করে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাকের ধাক্কায় আনোয়ার মালিথা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুন নিহত হন।

মাগুরায় সড়ক দুর্ঘটনায় গ্রামীণ বিদ্যুৎকর্মী জয়নাল নিহত হন। কুষ্টিয়ায় বাবার মৃত্যুর খবর শুনে জানাজায় যাওয়ার পথে নূর আলম জিকু মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান।

এ ছাড়া পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আলু ব্যবসায়ী বিপ্লব রায় নিহত এবং অপর চালক শুভ্রদেব রায় গুরুতর আহত হন।

৯ সেপ্টেম্বর, নিহত ৬, আহত অন্তত ১।

১০ সেপ্টেম্বর

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে দুই পর্যটকবাহী গাড়ির সংঘর্ষে একজন নিহত হন। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে সিএনজি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্যবসায়ী দুলাল দেব নিহত হন।

১০ সেপ্টেম্বর, নিহত ২, আহতের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়।

১১ সেপ্টেম্বর

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কুচিয়ামোড়া এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৌদি প্রবাসী হৃদয় নিহত এবং সাজ্জাদ আহত হন। বরিশালের গৌরনদীতে পৃথক দুর্ঘটনায় দুই মোটরসাইকেলচালক নিহত হন। ফেনীতে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় এক এনজিও কর্মকর্তা নিহত ও আরেকজন গুরুতর আহত হন।

এ ছাড়া আগের দিন হাওর ভ্রমণে যাওয়া গাজীপুরের আইনজীবীদের বহনকারী অটোরিকশা ও পর্যটকবাহী পিকআপের সংঘর্ষে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মিজানুর রহমান নিহত এবং আরও চার আইনজীবী আহত হন। দুর্ঘটনাটি ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঘটেছিল।

১১ সেপ্টেম্বর, নিহত ৫, আহত অন্তত ৬।

১২ সেপ্টেম্বর

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে কক্সবাজার ফেরার পথে মাইক্রোবাস ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সাতজন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

মাদারীপুরের শিবচরে মোটরসাইকেল রেস করতে গিয়ে ১৯ বছর বয়সী সাকিবুল হাসান নিহত হন। ঝিনাইদহে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বাইসাইকেল আরোহী সিরাজুল ইসলাম নিহত হন। টাঙ্গাইলের বাসাইলে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় রংমালা রানি নিহত হন। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে বাসের ধাক্কায় সাদিয়া আক্তার নিহত এবং অটোরিকশাচালকসহ তাঁর তিন স্বজন আহত হন।

১২ সেপ্টেম্বর, নিহত ৫, আহত অন্তত ১০।

১৩ সেপ্টেম্বর

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মাইক্রোবাসের চার যাত্রী নিহত হন এবং সাতজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে কনের ভাই-বোন, তাঁদের মামা ও মাইক্রোবাসচালক রয়েছেন।

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাসের ধাক্কায় সাংবাদিক কাজী আশরাফ নিহত হন। তিনি এশিয়ান টেলিভিশনের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি ছিলেন।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে তেলবাহী নছিমন খাদে পড়ে চালক নিহত হন। চুয়াডাঙ্গায় রাস্তা পার হওয়ার সময় পিকআপের ধাক্কায় এক বৃদ্ধা নিহত হন।

১৩ সেপ্টেম্বর, নিহত ৭, আহত অন্তত ৮।

মোট হিসাব

১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ঘটনাগুলোতে—

মোট নিহত: ৬৮ জন

নিশ্চিতভাবে উল্লেখ পাওয়া আহত: অন্তত ১৪০ জন

তবে এই সংখ্যা চূড়ান্ত জাতীয় পরিসংখ্যান নয়। কারণ কয়েকটি দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি, আবার গোপালগঞ্জের ৬ সেপ্টেম্বরের বাস দুর্ঘটনার মতো কিছু ঘটনায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আহতের সংখ্যা ভিন্নভাবে এসেছে। একইভাবে কোনো আহত ব্যক্তি পরে মারা গেলে নিহতের সংখ্যাও পরিবর্তিত হতে পারে।

সেপ্টেম্বরের এই ১৩ দিনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে আগস্টের চিত্রও মিলিয়ে দেখলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে আগস্টে দেশে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত এবং ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন; এর মধ্যে ১৮৩টি ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৭৬ জন।

অর্থাৎ সড়কে মৃত্যু এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই প্রতিদিন কোনো না কোনো পরিবার দুর্ঘটনার কারণে স্বজন হারাচ্ছে। কোথাও বিয়ের আনন্দের বাড়িতে পৌঁছাচ্ছে লাশ, কোথাও কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরা হচ্ছে শেষ যাত্রা, আবার কোথাও বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণ ফিরছেন কফিনে।