ব্রিটেন সংবাদ
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সামনে একসঙ্গে অর্থনীতি, অভিবাসন ও ঐক্যের সংকট—কোন পথে যাবে ব্রিটেন?
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর:
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহাম দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় পেরোয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সমালোচকদের অভিযোগ—বার্নহাম পরিবর্তনের কথা বললেও বাস্তবে সেই পরিবর্তনের গতি ও দিক এখনো স্পষ্ট নয়। গার্ডিয়ানের একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, তিনি কিয়ার স্টারমারের সময়কার নীতির তুলনায় নিজেকে বেশি বামঘেঁষা হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব নীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রমাণ এখনো সীমিত।
তবে বার্নহামের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু দলের ভেতরের সমালোচনা নয়। তাঁর সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি কঠিন জাতীয় প্রশ্ন—জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল অর্থনীতি, অভিবাসন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক অবস্থান।
অর্থনীতিই প্রথম পরীক্ষা
শরৎকালীন বাজেটের আগে ব্রিটিশ অর্থনীতি বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। জ্বালানি ও ঋণের ব্যয়, সরকারি ঋণের সুদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরকারের আর্থিক সুযোগ সীমিত করছে। গার্ডিয়ানের আজকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী বাজেটের আগে সরকারের হাতে থাকা আর্থিক সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর অর্থ হলো—বার্নহাম যদি জনগণের ওপর করের চাপ না বাড়িয়ে একই সঙ্গে NHS, সামাজিক সেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি খাতে ব্যয় বাড়াতে চান, তাহলে তাঁকে অত্যন্ত কঠিন হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে।
এই জায়গাতেই তাঁর নেতৃত্বের বাস্তব পরীক্ষা।
বামপন্থী প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তব রাজনীতি
বার্নহাম নিজেকে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে থাকা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু তাঁর সরকারের ওপর চাপ রয়েছে আরও বেশি সামাজিক ব্যয় এবং সম্পদের বৈষম্য কমানোর জন্য।
সম্প্রতি একটি নীতিপ্রতিবেদনে সম্পদ কর, বিনামূল্যে ব্যক্তিগত সামাজিক যত্ন এবং হাউস অব লর্ডস বিলুপ্তির মতো বড় সংস্কারের প্রস্তাব সামনে এসেছে।
অন্যদিকে বাস্তব অর্থনীতি সরকারের হাতে সীমিত অর্থ রেখে দিয়েছে। ফলে বার্নহামের সামনে প্রশ্ন—তিনি কি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবে প্রয়োগ করবেন, নাকি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক প্রতিশ্রুতি পিছিয়ে দেবেন?
ইউনিয়নও বড় পরীক্ষার মুখে
বার্নহামের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আরেকটি বিষয় হচ্ছে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ।
ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ আইওরওয়েথ আজ সরাসরি সতর্ক করেছেন যে ওয়েলসকে ইংল্যান্ডের কোনো অঞ্চল হিসেবে দেখা যাবে না; ওয়েলসকে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে সম্মান করতে হবে। একই সঙ্গে ওয়েলসের হাতে পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার মতো আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্কটল্যান্ডেও স্বাধীনতার প্রশ্ন আবার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। আর উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখতে চান। কিন্তু বার্নহামের সরকার জানিয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের নীতি পরিবর্তিত হয়নি। বর্তমানে নতুন গণভোটের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থন নেই বলেই সরকারের অবস্থান।
অর্থাৎ বার্নহামের সামনে এখন শুধু সরকার পরিচালনা নয়—যুক্তরাজ্যকে একসঙ্গে ধরে রাখার প্রশ্নও রয়েছে।
বাংলাদেশি ব্রিটিশদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য বার্নহাম সরকারের নীতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয়, ভাড়া ও বাড়ির দাম, NHS-এর চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, অভিবাসন ও নাগরিকত্বের নিয়ম—এসব সরাসরি প্রভাব ফেলে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ওপর।
বিশেষ করে অভিবাসন নিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে কঠোর অবস্থানের চাপ বাড়ছে। একদিকে Reform UK-এর উত্থান, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অসন্তোষ—এই দুইয়ের মাঝখানে বার্নহামকে এমন একটি নীতি তৈরি করতে হবে, যাতে অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ মোকাবিলা করা যায়, কিন্তু বৈধ অভিবাসী ও দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া না হয়।
পররাষ্ট্রনীতিতেও নতুন অবস্থান
বার্নহাম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তুলনামূলক সক্রিয় অবস্থান নিয়েছেন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ নিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
পাশাপাশি পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ অবস্থান জোরালো করার পক্ষে তিনি সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন এবং বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্রিটেনকে অবস্থান নিতে হবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও তাঁর সরাসরি আলোচনা হয়েছে। ফলে বার্নহামের সরকার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন ও মধ্যপ্রাচ্য—সব ক্ষেত্রেই নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।
তাহলে ব্রিটেন কোন পথে?
অ্যান্ডি বার্নহামের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত বিরোধী দল নয়; বরং মানুষের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান।
তিনি যদি NHS ও সামাজিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে চান, অর্থ দরকার। জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে চান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দরকার। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করতে চান, আবার দক্ষ শ্রমের ঘাটতিও পূরণ করতে হবে। আর একই সঙ্গে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
এই সবকিছুর মাঝখানে Reform UK-এর উত্থান তাঁর জন্য আরও বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
তাই বার্নহামের সামনে এখন আসল প্রশ্ন—তিনি কি শুধু স্টারমারের বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবেন, নাকি সত্যিই ব্রিটেনের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি নতুন মডেল তৈরি করতে পারবেন?
সমালোচকরা বলছেন, সময় খুব বেশি নেই। আর বার্নহামের সমর্থকদের কাছে এটাই তাঁর সুযোগ—একটি ভাঙতে থাকা রাজনৈতিক আস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলা।
ব্রিটেন এখন তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।