ব্রিটেন সংবাদ

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে’—ইইউ ইউনিয়নে ফেরার পরামর্শ দিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ওসবোর্ন

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে’—ইইউ  ইউনিয়নে ফেরার পরামর্শ  দিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ওসবোর্ন

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :

ব্রেক্সিটের ছয় বছর পর ব্রিটেনের ইউরোপনীতি নিয়ে নতুন করে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী জর্জ ওসবোর্ন যুক্তরাজ্যকে আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাস্টমস ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক বাধা কমানো এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম পথ হতে পারে।

ওসবোর্নের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে বর্তমান সরকারের অবস্থান এখনো কাস্টমস ইউনিয়নে ফিরে যাওয়া নয়। হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বার্নহাম সরকার ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে চাইলেও একক বাজার, কাস্টমস ইউনিয়ন ও মুক্ত চলাচলে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

ইউরোপই এখনো ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় বাজার

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করেছে। কিন্তু বাস্তব বাণিজ্যচিত্রে ইউরোপের গুরুত্ব কমেনি।

২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে ৩৮৪ বিলিয়ন পাউন্ডের রপ্তানি করেছে, যা দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৪১ শতাংশ। একই সময়ে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের আমদানি হয়েছে ৪৭২ বিলিয়ন পাউন্ড, যা মোট আমদানির প্রায় ৫০ শতাংশ

অর্থাৎ ব্রেক্সিট ব্রিটেনকে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করলেও ব্রিটিশ অর্থনীতি ইউরোপের বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং ইউরোপ এখনো ব্রিটেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার।

পণ্যের বাণিজ্যে চাপ বেশি

সমস্যার একটি বড় জায়গা হলো পণ্য রপ্তানি।

সরকারি সংসদীয় বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালে ইইউতে ব্রিটিশ পণ্য রপ্তানি ২০১৯ সালের তুলনায় বাস্তব মূল্যে ১৪ শতাংশ কম ছিল। একই সময়ে ইইউ-বহির্ভূত দেশগুলোতে ব্রিটিশ পণ্য রপ্তানি ২০১৯ সালের তুলনায় ৮ শতাংশ কম ছিল।

তবে সেবা খাতের চিত্র তুলনামূলকভাবে ভালো। ২০২৫ সালে ইইউতে ব্রিটিশ সেবা রপ্তানি ২০১৯ সালের তুলনায় বাস্তব মূল্যে ২৮ শতাংশ বেড়েছে। ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতির শক্তিশালী সেবা খাত কিছুটা ভারসাম্য তৈরি করেছে।

কাস্টমস ইউনিয়ন নিয়ে বিতর্ক কেন?

কাস্টমস ইউনিয়নে থাকলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পণ্য চলাচলে শুল্ক ও অনেক ধরনের কাস্টমস বাধা কম থাকে এবং বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে অভিন্ন শুল্কনীতি অনুসরণ করা হয়।

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন ইইউ কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজার—দুটির বাইরে চলে যায়। বর্তমানে ইইউর সঙ্গে বেশিরভাগ পণ্যে শুল্ক শূন্য থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে সীমান্তে কোনো বাণিজ্যিক বাধা নেই।

পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কাস্টমস ঘোষণা, নিয়ম মেনে চলা, পণ্যের উৎস প্রমাণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ব্যবসার খরচ বাড়িয়েছে। সংসদীয় গবেষণাতেও বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের পর ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যে অন্যান্য বাধা বেড়েছে।

খাদ্য ও কৃষিপণ্য খাতেও এর প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ইইউ ইতোমধ্যে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের জন্য স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধি সহজ করার লক্ষ্যে আলোচনা করছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থা কার্যকর হলে অনেক পণ্যের সার্টিফিকেশন ও সীমান্ত পরীক্ষা কমতে পারে।

অর্থনীতিতে ব্রেক্সিটের ক্ষতি কতটা?

এখানে কোনো একক সংখ্যা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সর্বসম্মতি নেই। তবে ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটিশ অর্থনীতি যে সম্ভাব্য অবস্থার তুলনায় ছোট হয়েছে—এ বিষয়ে মূলধারার অর্থনৈতিক গবেষণায় যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে।

হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বিভিন্ন গবেষণার হিসাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের জিডিপি ইইউতে থেকে গেলে যে পর্যায়ে থাকতে পারত তার তুলনায় আনুমানিক ২ থেকে ৮ শতাংশ কম হতে পারে। সরকারি স্বাধীন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস সংস্থা ওবিআর দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও জিডিপি প্রায় ৪ শতাংশ কম হওয়ার পূর্বাভাস ধরে কাজ করছে।

তবে এর পুরো দায় শুধু ব্রেক্সিটের ওপর চাপানোও অর্থনৈতিকভাবে সরলীকরণ হবে। করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতাও ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। সংসদীয় গবেষণাতেও এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে কি কাস্টমস ইউনিয়নে ফেরার পথ খুলছে?

রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি এখনো অনেক দূরের।

বার্নহাম সরকারের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক বাধা কমাতে কতটা এগোনো হবে, কিন্তু একই সঙ্গে ব্রেক্সিটের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা অক্ষুণ্ণ রাখা হবে।

সরকার ইতোমধ্যে ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন পর্যালোচনা ও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের ঘোষিত অবস্থান হলো—ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা হবে, কিন্তু একক বাজার বা কাস্টমস ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়নি।

ফলে ওসবোর্নের দাবি আপাতত সরকারের নীতির চেয়ে অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী একটি রাজনৈতিক প্রস্তাব।

ব্রিটিশ জনগণের জন্য আসল প্রশ্ন

ব্রেক্সিটের বিতর্ক এখন আর শুধু ‘ইউরোপে থাকা না থাকা’ নিয়ে নয়। প্রশ্নটি ক্রমেই বাস্তব অর্থনীতিতে এসে ঠেকছে—ব্রিটিশ ব্যবসার জন্য ইউরোপের বাজারে প্রবেশ কতটা সহজ হবে, সীমান্তে পণ্যের চলাচল কতটা দ্রুত হবে এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়ের বোঝা কে বহন করবে?

২০২৫ সালে ইইউ ব্রিটেনের মোট রপ্তানির ৪১ শতাংশ এবং আমদানির প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের সামান্য পরিবর্তনও ব্রিটিশ ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে কাস্টমস ইউনিয়নে ফিরে গেলে ব্রিটেনের স্বাধীন বাণিজ্যনীতির কিছু অংশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠবে। ব্রেক্সিটপন্থীদের কাছে এটিই হবে সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা।

সুতরাং জর্জ ওসবোর্নের বক্তব্যকে শুধু একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীর রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি আসলে ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মৌলিক প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে—ইউরোপ থেকে রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখেও কি ইউরোপের বাজারের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ থাকা সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে বার্নহাম সরকারের ইউরোপনীতি এবং ব্রিটেনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।