“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৮।। ভাঙনের শব্দ শুনি: তাহলে কি সত্যি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চার টুকরো হয়ে যাচ্ছে?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৮।। ভাঙনের শব্দ শুনি: তাহলে কি সত্যি ব্রিটিশ  সাম্রাজ্য চার টুকরো হয়ে যাচ্ছে?

উৎসর্গ
স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সেই সব মানুষের প্রতি—
যারা বিভাজনের নয়, ঐক্যের ব্রিটেন দেখতে চান;
যারা বিশ্বাস করেন, ভিন্ন পরিচয় ও ভিন্ন মতের মধ্যেও চার জাতি একসঙ্গে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ United Kingdom গড়ে তুলতে পারে।

ব্রিটিশ রাজনীতির আকাশে কি সত্যিই ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে? স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিয়ে একসঙ্গে কথা বলছেন,এখন যুক্তরাজ্যের সামনে নতুন এক সাংবিধানিক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে।

ব্রেকজিটের পর ইউরোপ থেকে দূরত্ব, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবি, ওয়েলসের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে Irish unity-এর আলোচনা—সব মিলিয়ে পুরোনো ইউনিয়ন আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি পরীক্ষার মুখে।

তবু চার দেশের মানুষের ইতিহাস, অর্থনীতি, পারিবারিক বন্ধন ও দীর্ঘদিনের সহাবস্থানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই প্রশ্ন শুধু ‘ব্রিটেন ভাঙবে কি না’ নয়; বরং ভিন্ন পরিচয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করেও কি চার দেশ একসঙ্গে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ United Kingdom হিসেবে থাকতে পারে?

কার্ডিফে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতাদের সাম্প্রতিক বৈঠক যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। তিন দেশের নেতারা ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ এবং সম্ভাব্য সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য Westminster সরকারের প্রস্তুতির কথা বলেছেন। তাই পুরো ব্রিটেনের জনগনের মধ্যে একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে মনে, তাহলে সত্যি সত্যি কি একদার বিশ্ব শাসন করা দৌদন্ড প্রতাবশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে ৪ টুকরো হয়ে যাচ্ছে?

এখন যে আলোচনা চলছে, এটি এখনই যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার ঘোষণা নয়। কিন্তু একসময় যে প্রশ্নটি কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আলোচনায় ছিল, সেটি এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

তিন দেশের লক্ষ্য এক নয়

স্কটল্যান্ডের লক্ষ্য সবচেয়ে স্পষ্ট—স্বাধীনতা এবং পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। ২০১৬ সালের গণভোটে স্কটল্যান্ডের ৬২ শতাংশ মানুষ EU-তে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। অথচ যুক্তরাজ্যজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে স্কটল্যান্ডকেও Brexit মেনে নিতে হয়।

ওয়েলসের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়, অধিক রাজনৈতিক ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি বড় হয়ে উঠছে। Plaid Cymru স্বাধীনতার পক্ষে হলেও এখনই গণভোট চায় না।

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের হিসাব আবার আলাদা। Sinn Féin-এর লক্ষ্য স্বাধীন নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড নয়; আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়া। Good Friday Agreement-এর অধীনে জনসমর্থন তৈরি হলে ভবিষ্যতে এ প্রশ্নে গণভোট হতে পারে।

ইউরোপ কি বড় কারণ?

তিন দেশের রাজনৈতিক লক্ষ্য আলাদা হলেও Brexit তাদের আলোচনায় একটি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ডে প্রশ্নটি প্রবল—তারা যে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল, তার ফল কেন তাদের বহন করতে হবে?

তবে স্বাধীনতা মানেই স্বয়ংক্রিয় EU সদস্যপদ নয়। স্বাধীন স্কটল্যান্ডকে EU-তে যোগ দেওয়ার জন্য পৃথক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

ইংল্যান্ড কোথায়?

এই আলোচনায় সবচেয়ে বড় অনুপস্থিত পক্ষ ইংল্যান্ড। তিন দেশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে একই ধরনের আলোচনা নেই।

ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যকে ধরে রাখতে হলে ফেডারেল ব্যবস্থা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কিংবা ইংল্যান্ডের জন্য পৃথক রাজনৈতিক কাঠামোর প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বারহামের এখন কঠিন পরীক্ষা

জনাব এন্ডি বারহামের সামনে তাই কঠিন ভারসাম্য। ইউনিয়ন রক্ষা করতে গিয়ে যদি গণতান্ত্রিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে অস্বীকার করা হয়, বিচ্ছিন্নতাবাদ আরও শক্তিশালী হতে পারে। আবার গণভোটের সুযোগ দিলেই যে যুক্তরাজ্য ভেঙে যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।

যুক্তরাজ্য এখনো ভেঙে যায়নি। চার টুকরো হয়ে যাওয়াও অবশ্যম্ভাবী নয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—ইউনাইটেড কিংডমের অখণ্ডতা আর স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

কার্ডিফের বৈঠক তাই শুধু একটি রাজনৈতিক বৈঠক নয়; এটি ব্রিটিশ রাষ্ট্রকাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় সতর্ক সংকেত।

প্রশ্ন এখন একটাই—পুরোনো কাঠামো বদলে যুক্তরাজ্য কি নতুন সমঝোতায় টিকে থাকবে, নাকি একদিন তার অংশগুলো সত্যিই নিজেদের পথ বেছে নেবে?

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,   ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬