বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন: স্বাধীনতার পর থেকে ত্রয়োদশ নির্বাচন পর্যন্ত পূর্ণ চিত্র
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৬ ফেব্রুয়ারি:
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে মূলত তিনটি দলের মধ্যে—আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টি দুবার সরকার গঠন করেছে। ভোটের হার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নির্বাচন বর্জন, বিতর্ক—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাস এক জটিল, পরিবর্তনশীল ও রাজনৈতিকভাবে উত্তাল পথচলার দলিল।
সামগ্রিক চিত্র: কে কতবার ক্ষমতায়
- আওয়ামী লীগ: ৬ বার সরকার গঠন
- বিএনপি: ৪ বার সরকার গঠন
- জাতীয় পার্টি: ২ বার সরকার গঠন
ভোটের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, যেখানে ভোটের হার ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, যেখানে ভোটের হার ছিল মাত্র ৪০.০৪ শতাংশ—এ নির্বাচনকে ঘিরে ছিল ব্যাপক বিতর্ক, বর্জন ও সহিংসতার প্রেক্ষাপট।
প্রথম সংসদ নির্বাচন ১৯৭৩: স্বাধীনতার পর প্রথম গণরায়
তারিখ: ৭ মার্চ ১৯৭৩
ভোটের হার: ৫৫.৬১%
স্বাধীনতার মাত্র দুই বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলে ছিলেন জাতীয় লীগ ও জাসদের একজন করে প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র পাঁচজন।
এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস। মুক্তিযুদ্ধের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন, সংবিধান বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল এই সংসদকাল।
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৯: সামরিক শাসন থেকে নির্বাচনী রাজনীতিতে বিএনপি
তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯
ভোটের হার: ৫১.২৯%
সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে গঠিত বিএনপি প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলো মিলে পায় ৭৭টি আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি, জাসদ ৮টি, মুসলিম ও ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি, ন্যাপ, গণফ্রন্ট, সাম্যবাদী দলসহ আরও কয়েকটি ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে বাকি আসনগুলো ভাগাভাগি হয়।
এই সংসদের মেয়াদ ছিল ৩ বছর। সামরিক পটভূমি থেকে আসা শাসকগোষ্ঠীর নির্বাচনী বৈধতা অর্জনের একটি বড় প্রচেষ্টা ছিল এই নির্বাচন।
তৃতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৮৬: বিএনপির বর্জন, জাতীয় পার্টির উত্থান
তারিখ: ৭ মে ১৯৮৬
ভোটের হার: ৬৬.৩১%
এই নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে, ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে।
- জাতীয় পার্টি: ১৫৩ আসন
- আওয়ামী লীগ: ৭৬ আসন
- অন্যান্য বাম ও ছোট দল (সিপিবি, ন্যাপ, বাকশাল, জাসদের বিভিন্ন অংশ, জামায়াত, মুসলিম লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি): উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন
- স্বতন্ত্র প্রার্থী: ৩২ আসন
এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১৭ মাস। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এই নির্বাচনকে দেখা হয়, যা পরবর্তীতে বিরোধী আন্দোলনের মুখে টেকসই হতে পারেনি।
চতুর্থ সংসদ নির্বাচন ১৯৮৮: বিরোধী দলের বর্জন, একক আধিপত্য
তারিখ: ৩ মার্চ ১৯৮৮
ভোটের হার: ৫১.৮১%
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক ধরনের নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়।
- জাতীয় পার্টি: ২৫১ আসন
- সম্মিলিত বিরোধী দল: ১৯ আসন
- স্বতন্ত্র প্রার্থী: ২৫ আসন
- জাসদ (সিরাজ): ৩টি, ফ্রিডম পার্টি: ২টি আসন
এই সংসদের মেয়াদ ছিল ২ বছর ৭ মাস। বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত থেকে যায়।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচন ১৯৯১: গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন
তারিখ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১
ভোটের হার: ৫৫.৪৫%
এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের পর তত্ত্বাবধায়কধর্মী অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় এই নির্বাচন।
- বিএনপি: ১৪০ আসন
- আওয়ামী লীগ: ৮৮ আসন
- জাতীয় পার্টি: ৩৫টি
- জামায়াতে ইসলামী: ১৮টি
- অন্যান্য বাম ও ছোট দল, স্বতন্ত্র: কয়েকটি আসন
এই সংসদের মেয়াদ ছিল ৪ বছর ৮ মাস। এই নির্বাচনের পর গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে যায়, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় মোড়।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি): স্বল্পস্থায়ী ও বিতর্কিত
তারিখ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬
ভোটের হার: (উল্লেখ নেই, তবে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত)
এই নির্বাচনে ৪১টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়, তবে প্রধান বিরোধী দলগুলো কার্যত বর্জনের পথে ছিল।
- বিএনপি: ২৭৮ আসন
- ফ্রিডম পার্টি: ১টি
- স্বতন্ত্র: ১০টি
এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন। বিরোধী দলের তীব্র আন্দোলন, হরতাল, অবরোধের মুখে এই সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সপ্তম সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ (১২ জুন): ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ
তারিখ: ১২ জুন ১৯৯৬
ভোটের হার: ৭৪.৯৬%
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
- আওয়ামী লীগ: ১৪৬ আসন
- বিএনপি: ১১৬ আসন
- জাতীয় পার্টি: ৩২টি
- জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, জাসদ ও স্বতন্ত্র: কয়েকটি আসন
এই সংসদের মেয়াদ ছিল ৫ বছর। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে।
অষ্টম সংসদ নির্বাচন ২০০১: বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভূমিধস জয়
তারিখ: ১ অক্টোবর ২০০১
ভোটের হার: ৭৫.৫৯%
এই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুলভাবে জয়লাভ করে।
- বিএনপি: ১৯৩ আসন
- আওয়ামী লীগ: ৬২ আসন
- জামায়াতে ইসলামী: ১৭টি
- জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট: ১৪টি
- অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র: কয়েকটি আসন
সংসদের মেয়াদ ছিল ৫ বছর। এই সময়টায় রাজনৈতিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও উঠে আসে।
নবম সংসদ নির্বাচন ২০০৮: সর্বোচ্চ ভোট, মহাজোটের জোয়ার
তারিখ: ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮
ভোটের হার: ৮৭.১৩% (স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ)
দীর্ঘ জরুরি শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংস্কারের আলোচনার পর অনুষ্ঠিত হয় এই নির্বাচন।
- আওয়ামী লীগ: ২৩০টি আসন
- বিএনপি: ৩০টি
- জাতীয় পার্টি: ২৭টি
- জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, এলডিপি, জামায়াত, বিজেপি, স্বতন্ত্র: বাকি আসনগুলো
এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তি তৈরি হয়।
দশম সংসদ নির্বাচন ২০১৪: সর্বনিম্ন ভোট, সর্বোচ্চ বিতর্ক
তারিখ: ৫ জানুয়ারি ২০১৪
ভোটের হার: ৪০.০৪% (সবচেয়ে কম)
বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোট এই নির্বাচন বর্জন করে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায় আওয়ামী লীগ ও শরিকরা।
- আওয়ামী লীগ: ২৩৪ আসন
- জাতীয় পার্টি: ৩৪টি
- ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু), তরীকত ফেডারেশন, জেপি, বিএনএফ, স্বতন্ত্র: বাকি আসনগুলো
এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে সহিংসতা, সন্ত্রাস, অবরোধ, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মহলেও নির্বাচনটি ব্যাপক সমালোচিত হয়।
একাদশ সংসদ নির্বাচন ২০১৮: উচ্চ ভোট, একতরফা আধিপত্যের অভিযোগ
তারিখ: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮
ভোটের হার: ৮০.২০%
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৮টি আসন পায়।
- জাতীয় পার্টি: ২২টি
- মহাজোটের অন্য দল: ৮টি
- বিএনপি: ৬টি
- গণফোরাম: ২টি
- স্বতন্ত্র: ৩টি
বিরোধী দলগুলো ভোট ডাকাতি, কেন্দ্র দখল, এজেন্ট বের করে দেওয়া, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বসহ নানা অভিযোগ তোলে। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৪: বর্জন, কম ভোট, স্বল্পস্থায়ী সংসদ
তারিখ: ৭ জানুয়ারি ২০২৪
ভোটের হার: ৪১.৮%
এই নির্বাচনে বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত দল নির্বাচন বর্জন করে।
- আওয়ামী লীগ: ২২২ আসন
- জাতীয় পার্টি: ১১টি
- ওয়ার্কার্স পার্টি: ১টি
- জাসদ: ১টি
- কল্যাণ পার্টি: ১টি
- স্বতন্ত্র প্রার্থী: ৬২টি আসন
এই সংসদ স্থায়ী হয় মাত্র ৬ মাস ৭ দিন। বিতর্কিত নির্বাচনী পরিবেশ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে এই সংসদও স্থায়িত্ব পায়নি।
গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬:
বছর: ২০২৬
ভোট: ৫৯.৯১%
ভোটার সংখ্যা: ১২,৭৭,১১,৭৯৩ জন
আসন: ২৯৯
নিবন্ধিত দল: ৬০টির মধ্যে ৫০টি অংশগ্রহণ
প্রার্থী সংখ্যা:
- দলীয় প্রার্থী: ১,৭৫৫ জন
- স্বতন্ত্র প্রার্থী: ২৭৩ জন
- নারী প্রার্থী: ৮৩ জন (দলীয় ৬৩, স্বতন্ত্র ২০)
- পুরুষ প্রার্থী: ১,৯৪৬ জন (দলীয় ১,৬৯২, স্বতন্ত্র ২৫৩)
নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৬০টি দলের মধ্যে ৫১ টি অংশ নেয়। এদের মধ্যে জাতীয় পার্টির (জাপা) ২২৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৪৪ জন, সিপিবির ৬৫ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৪১ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৯৪ জন, খেলাফত মজলিসের ৬৮ জন, গণ অধিকার পরিষদের ১০৪ জন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির ৫৩ জন, গণফোরামের ২৩ জন, গণসংহতি আন্দোলনের ১৮ জন, নাগরিক ঐক্যের ১১ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ১১ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ৫ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
প্রাপ্ত আসন সংখ্যা
বিএনপি ২০৯ টি আসন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন
জাতীয় নাগরিক পাটি ৬ আসন
অন্যান্য ১৪ আসন
জাতীয় পার্টি ০ আসন
৪১ টি রাজনৈতিক দল কোন আসন পায়নি।