‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৩ ।। বন্ধুপ্রতিম ‘অপ্রতিম’ কেন মাটির কোলে?

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৩ ।। বন্ধুপ্রতিম ‘অপ্রতিম’ কেন মাটির কোলে?

বন্ধুপ্রতিম ‘অপ্রতিম’ কেন মাটির কোলে?

উৎসর্গ

অপ্রতিমের মতো অকালে হারিয়ে যাওয়া সব শিশুর স্মৃতির প্রতি—
এবং সেইসব মা-বাবার প্রতি,
যাঁরা প্রতিদিন সন্তানকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে অপেক্ষায় থাকেন,
সন্তানটি আবার দরজায় ফিরে আসবে বলে।

শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির নুরজাহান ভিলার তৃতীয় তলায় ছেলেকে খাওয়াচ্ছেন কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। বাবা শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম—পুরো নাম ইশায়াত শাহরিয়ার—বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে খুব ভালোবাসত সে। বন্ধুদের কাছে ছিল বন্ধুবৎসল, শান্ত ও সবার প্রিয়। সেদিনও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে যাবে বলেই মায়ের আইফোনটি চেয়েছিল।

খাওয়া শেষে বাবা ছেলেকে বলেন—

—বাবা, তুমি আজ বাইরে যেয়ো না। আমরা একসঙ্গে একটু ঘুরব, বাসায় মুভি দেখব। বিকেলে তোমাকে একটা ভালো গিফট দেব।

অপ্রতিম তখন হেসে বলে—

—বাবা, একটু বের হই। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলব। বেশি দেরি করব না।

দুপুর আড়াইটার দিকে মায়ের আইফোনটি সঙ্গে নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। কেউ তখনও জানত না, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়া সেই ছেলেটিই আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও অপ্রতিম আর ফেরে না। ফোনের অবস্থান শনাক্ত করে দেখা যায়, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সেটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের গন্ধমতী এলাকায় ছিল। এরপর ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা খোঁজ শুরু করেন।

শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজনকে আটক করা হয়। তবে কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে এবং হত্যার প্রকৃত কারণ কী, তা তখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটিও উদ্ধার হয়নি।

খবর পেয়ে অপ্রতিমের বাড়িতে ছুটে আসেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। সন্তানের মরদেহের পাশে ভেঙে পড়া মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন—

—এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।

পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন—

—আমি এ এলাকার এমপি হিসেবে লজ্জিত ও দুঃখিত। এক মাসুম বাচ্চাকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। ৯০ দিনের মধ্যে এ ঘটনার বিচার শেষ করতে হবে।

অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মুঠোফোনের যন্ত্রাংশের ব্যবসা করেন। একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই ছিল তাঁদের সাজানো সংসার।

মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন—

আমার ছোট্ট ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর সময় ছেলেটা কীভাবে ছটফট করেছিল, কে জানে। আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব। যারা আমার ছেলেকে খুন করেছে, আমি তাদের বিচার চাই।

বাবা তখন ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন—

—অপ্রতিম ছিল আমাদের পৃথিবী। তাকে নিয়েই আমাদের সাজানো সংসার। কিন্তু সামান্য একটি আইফোনের জন্য আমার ছেলেটা আজ পৃথিবীতে নেই। কেন আমার ছেলেটাকে এভাবে হত্যা করা হলো, আমি তার বিচার চাই।

ছেলেকে নিয়ে মায়ের বুকভরা স্বপ্ন ছিল। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন—

—ছেলেটাকে নিয়ে বুকভরা স্বপ্ন ছিল। কোনোভাবেই মানতে পারছি না, আমার সেই ছেলে এখন লাশ।

এরপর তিনি ছেলের জামা বুকে জড়িয়ে আবারও বলেন—

আমার একটাই মাত্র ছেলে। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব সারাজীবন? তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন? এইরকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। অপ্রতিম আমার বুকের মানিক, তোকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব, বাবা।

অপ্রতিমের বাড়ির দেয়ালে ছোটবেলা থেকে স্কুলজীবন পর্যন্ত তার অসংখ্য ছবি। দরজার পাশে কাঠের ফলকে লেখা—‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে নাহিদ ও শাহরিয়ার’। নামটি এখনো আছে, শুধু অপ্রতিম নেই।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন—

—শুধুমাত্র একটি আইফোনের জন্য ছেলেটাকে মেরে ফেললি। নিখোঁজ অপ্রতীমকে মেরে ফেলা হয়েছে। হে আল্লাহ বাবা-মাকে ধৈর্য ধরার তৌফিক দান করুন।

স্কুলে অপ্রতিমের খালি বেঞ্চ পড়ে থাকে। যে ছেলেটি প্রতিদিন সহপাঠীদের সঙ্গে বসত, সেই জায়গায় এখন শুধু তার স্মৃতি। শিক্ষক হাজিরা নিতে গিয়ে ডাকেন—

—ইশায়াত শাহরিয়ার?

কোনো উত্তর আসে না।

এক সহপাঠী জিজ্ঞেস করে—

—স্যার, অপ্রতিম কি আর আসবে না?

শিক্ষক কোনো উত্তর দিতে পারেন না।

অপ্রতিমের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান ছবির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন

অপ্রতিম তো কারও ক্ষতি করতে বের হয়নি। পড়াশোনায় ভালো ছিল। একটু চুপচাপ, মিশুক ও শান্ত স্বভাবের। স্কুলে অপ্রতিমকে কখনো কোনো ঝামেলায় জড়াতে দেখা যায়নি। সহপাঠীদের কাছ থেকেও তার সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু শোনা যায়নি। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে, হাসবে, একটু সময় কাটাবে—এই ছিল তার চাওয়া। যে ছেলে বন্ধুদের ভালোবাসত, বন্ধুদের জন্য মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়েছিল, তার এই পরিণতিই কি তার পুরস্কার হওয়া উচিত ছিল এই সমাজের? এই রাষ্ট্রের কাছে অপ্রতিমের পাওনা কি ছিল একটি লাশ? একটি মায়ের বুক খালি করে দেওয়া? একটি বাবার পৃথিবী শেষ করে দেওয়া? বন্ধুপ্রতিম অপ্রতিমকে কেন আজ মাটির কোলে আশ্রয় নিতে হলো?

ঘরের দেয়ালে অপ্রতিমের ছবিগুলো তখনও ঝুলছে। দরজার পাশে লেখা—‘অপ্রতিমদের বাসা, প্রযত্নে নাহিদ ও শাহরিয়ার’। অথচ সেই বাসায় অপ্রতিম আর কোনোদিন ফিরবে না।

লন্ডন, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬