ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৫ ।। পদ্মা ব্যারেজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং একটি পর্যালোচনা

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৫ ।। পদ্মা ব্যারেজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং একটি পর্যালোচনা

উৎসর্গ

“পদ্মা ও তার শাখা–প্রশাখার তীরে বসবাসকারী সেই সব মানুষের প্রতি, যাদের জীবন নদীর স্রোতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে”

বাংলাদেশে বড় কোনো পানি প্রকল্প এলেই একটি পরিচিত ভাষা শোনা যায়—“এটি বদলে দেবে দক্ষিণাঞ্চলের চিত্র”, “পুনরুজ্জীবিত হবে নদী”, “বাড়বে কৃষি উৎপাদন”, “রক্ষা পাবে পরিবেশ”। ষাটের দশকে বাঁধ, আশির দশকে পোল্ডার, পরে রেগুলেটর, স্লুইসগেট, নদীশাসন—প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রেই এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই একই ভাষায় হাজির হয়েছে পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প।

কিন্তু বাংলাদেশের নদীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নদীকে কাগজে-কলমে জয় করা যায় না। নদীকে আটকে রেখে উন্নয়নের স্বপ্ন যতবার আঁকা হয়েছে, ততবারই প্রকৃতি পরে তার প্রতিশোধ নিয়েছে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি সত্যিই পানির সংকট সমাধান করবে, নাকি সংকটকে শুধু এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় সরিয়ে দেবে?

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে ঘিরে বড় উন্নয়নের স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। কিন্তু নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সঠিক মূল্যায়ন ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে একের পর এক জটিল সংকট তৈরি হতে পারে। সাধারণ মানুষের সহজ বোঝার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

উজানে নদী ভরাট হওয়ার আশঙ্কা
ব্যারাজের কারণে পানির স্বাভাবিক গতি কমে গেলে নদীতে পলি জমা বাড়বে। এতে ধীরে ধীরে নদীতল উঁচু হয়ে যেতে পারে। ফলাফল হবে—বন্যা বৃদ্ধি, নাব্যতা সংকট এবং নতুন চর সৃষ্টি।

নদীভাঙন আরও ভয়াবহ হতে পারে
উজানে পলি জমলেও ভাটিতে পানির সঙ্গে পলি কম পৌঁছাবে। তখন নদী নিজের ভারসাম্য ফেরাতে তীর ভাঙতে শুরু করবে। এতে উজান ও ভাটি—দুই এলাকাতেই ভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে।

ভাটির এলাকায় পানির ঘাটতি বাড়বে
পাংশার আগে পানি আটকে রাখলে নিচের অঞ্চলে পানির প্রবাহ কমে যাবে। গোয়ালন্দ, শরীয়তপুর, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বহু এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্বল্পতা বাড়লে কৃষিতে সেচ সমস্যা তৈরি হবে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়বে
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে মাছের চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হবে। এতে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে।

লবণাক্ততা দেশের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে
মেঘনা মোহনায় মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি আরও গভীরে প্রবেশ করবে। এতে কৃষিজমি, সুপেয় পানি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সুন্দরবনের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে
সুন্দরবন টিকে আছে মিঠাপানির ওপর। পদ্মা-মেঘনায় পানির প্রবাহ কমে গেলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

হাওর এলাকাও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে পড়তে পারে
লবণাক্ততার প্রভাব ধীরে ধীরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকাতেও পৌঁছাতে পারে। এতে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যারাজ নিজেই ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ সংকটে পড়তে পারে
পলি জমে আন্ডারস্লুইস বা পানি নির্গমনপথ বন্ধ হয়ে গেলে ব্যারাজের কার্যকারিতা কমে যাবে। তখন নতুন করে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন হবে।

আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়তে পারে
এক অঞ্চলে সুবিধা দিতে গিয়ে অন্য অঞ্চলে পানির সংকট তৈরি হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়তে পারে।

ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ কমে যেতে পারে
বাংলাদেশ যদি নিজস্ব ব্যারাজ দিয়ে সংকট সামাল দেওয়ার পথে হাঁটে, তাহলে গঙ্গার ন্যায্য পানির হিস্যা নিয়ে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমে যেতে পারে।

এখন সরকারের কী করা উচিত ?

গঙ্গার ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে
ভারতের সঙ্গে নতুন পানি চুক্তির জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জোরালো করতে হবে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী সনদে যোগ দেওয়া জরুরি
আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ সনদে যুক্ত হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবে।

নদীগুলোকে দখল ও কৃত্রিম বাধা থেকে মুক্ত করতে হবে
স্লুইসগেট, অপরিকল্পিত বাঁধ, দখল ও সংকীর্ণ কালভার্টের কারণে বহু নদী মৃতপ্রায়। এগুলো অপসারণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।

পোল্ডার ও বাঁধ ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে
যেসব বাঁধ ও পোল্ডার এখন জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলো নতুনভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

স্থানীয় খাল ও জলপথ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে
শুধু বড় প্রকল্প নয়, ছোট নদী ও খাল পুনরুদ্ধারেও জোর দিতে হবে। এতে কম খরচে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব।

ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করতে হবে
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হবে, যা ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পরিবেশগত সমীক্ষা প্রয়োজন
শুধু প্রকল্পের সুবিধা নয়, সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়েও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করতে হবে।

স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে
নদীর পাশে বসবাসকারী মানুষের মতামত ছাড়া এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।

কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যেতে হবে
হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের বদলে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

নদীকে নিয়ন্ত্রণ নয়, সহাবস্থানের দৃষ্টিতে দেখতে হবে
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার চিন্তায়। নদীকে শুধু শাসনের বস্তু হিসেবে না দেখে, তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশকে সম্মান করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২০ মে ২০২৬