ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৩ ।। আমেরিকা–বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি : এতে কি মিলবে জাতির মুক্তি?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৩ ।। আমেরিকা–বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি : এতে কি মিলবে জাতির মুক্তি?

উৎসর্গ 
“বাংলাদেশের সেই সব সাধারণ মানুষদের, যাদের শ্রমে এই অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তে যাদের কণ্ঠ প্রায়ই শোনা যায় না।”

ইউনুস সরকারের বিদায়ের মাত্র তিনদিন আগে তড়িঘড়ি করে আমেরিকার সাথে অসম একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি নিয়ে জনগনের মধ্যে কিছু কিছু  ইউটিউব আলোচক সরব হলেও সরকার এবং বিরোধী দল নিরব। কারো কন্ঠে নাই কোন রব। তাই চুক্তিটি পড়ে দেখলাম। অনেক কিছু শিখলাম। কিছুটা নিজেও বুঝলাম। তাই আজ এ নিয়ে সংক্ষেপে এ কলাম লিখলাম। বেশ কয়েক পৃষ্টার চুক্তি। অনেক লেখা। পড়ে হতাশ বা চিন্তিত না হয়ে পারা যায় না। 

এ চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা এবং কৌশলগত অবস্থান নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শুল্ক ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই চুক্তির ভেতরের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত বাঁধনের সূচনা।

চুক্তির কাঠামোতে যেমন কিছু সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, তেমনি এর ভেতরের সূক্ষ্ম শর্তগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনৈতিক স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

 

চুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো

. পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া

চুক্তির অন্যতম বড় শর্ত হলো, বাংলাদেশ চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য “অ-বাজার অর্থনীতি”র সঙ্গে এমন কোনো বাণিজ্য বা বিনিয়োগ চুক্তি করতে পারবে না যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী।
এর ফলে “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব” নীতি বাস্তবে সীমিত হয়ে যেতে পারে।

 

. চীন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে রাশিয়ার ভূমিকা, চীনা বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ শিল্প সহযোগিতা এই বিধিনিষেধের কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একক কূটনৈতিক অক্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

 

. কমার্শিয়াল বাধ্যবাধকতা বড় অঙ্কের ক্রয় চাপ

চুক্তির কমার্শিয়াল কনসিডারেশন অংশে বলা হয়েছে— বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে ১৪টি, ১৫ বছরে জ্বালানি কিনবে ১৫শো কোটি ডলারের,
বছরে কৃষিপণ্য আমদানি করবে সাড়ে তিনশো কোটি ডলারের। ইতোমধ্যে ১৪ প্লেন কেনার চুক্তি হয়ে গেছে।

এ ধরনের নির্দিষ্ট অঙ্কভিত্তিক ক্রয় অর্থনীতির স্বাভাবিক চাহিদার বদলে কাঠামোগত আমদানি নির্ভরতা তৈরি করে।

 

. নীতিগত আইনি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি

নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন, মেধাসত্ত্ব আইন ও টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষকদের বক্তব্য— "এখানে আমেরিকার চালাকিটা হচ্ছে যে, পাল্টা শুল্কের কথা বলে তারা যেটা করেছে সেটা হলো, তাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসিডিউর এবং লিগ্যাল সিস্টেমটাকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। টেকনিক্যাল স্টান্ডার্ড, মেধাস্বত্ত্ব এগুলো দিয়ে ওরা আমাদের উপরে উঠে যাবে।"

আরও বলা হয়েছে—"আমরা ওদেরকে কোনো নন-ট্যারিফ বাধা বা কারিগরি মানের কথা বলে ওদের পণ্যে কোনো বাধা দিতে পারবো না। কিন্তু ওরা কিন্তু পারবে। ওরা বলবে দেখো, তোমার পণ্যের কারিগরি মান আমাদের মতো না। সুতরাং এই পণ্য নিতে পারবো না। কিন্তু আমরা এরকম কিছু বলতে পারবো না।" ওদের কাছ থেকে ওষধপত্র, খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি কিনতে হবে। আবার এসব পণ্যের গুণগত মান নিয়ে কোন প্রশ্ন করা যাবে না।  

. শুল্ক সুবিধা থাকলেও লাভ অনিশ্চিত

"এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে কমে এসেছে। এই চুক্তির একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা।"

তবে এই সুবিধার বিপরীতে উৎপাদন খরচ বাড়লে প্রকৃত লাভ কমে যেতে পারে।

 

. রাজস্ব ক্ষতি আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি

অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড অনুযায়ী— যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্য ও বাংলাদেশের ১,৬৩৮টি পণ্য শুল্ক ছাড়ের আওতায় আসবে।
এতে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমার ঝুঁকি রয়েছে।

 

. প্রতিরক্ষা কৌশলগত নির্ভরতা

"বাংলাদেশ ডিফেন্সে আর কতটুকুই বা কিনবে। কিন্তু আমাদের ডিফেন্স যখন ওদের সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টেগ্রেড হয়ে গেলো তখন আমাদের ডিফেন্স স্ট্রাটেজি তো ওদের স্ট্রাটেজির বাইরে যেতে পারবে না।"

এটি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

 

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপির নবগঠিত সরকার এই চুক্তি নিয়ে কী করবে?

বিষয়টি নিয়ে নতুন সরকারের কেউই এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেননি। তবে চুক্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ থাকলেও তা বাস্তবে কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে এই চুক্তি একদিকে শুল্ক সুবিধা ও বাজার প্রবেশাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে নীতিগত স্বাধীনতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। সুতরাং এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই অসম বাণিজ্য চুক্তি কি যুক্তি দিয়ে বাতিল করা হবে কি না? 

এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করলে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা গভীরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত এই চুক্তিতে নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে বাতিল করার সুযোগ থাকলেও, বিষয়টি একতরফাভাবে এগিয়ে নেওয়া সমীচীন হবে না। তার মতে, “বাতিল করলে কী প্রভাব পড়বে, সেটি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, চুক্তিটির ভেতরে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শর্ত সংশোধনের সুযোগও রয়েছে। সে কারণে সরকার এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না গিয়ে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার পথে এগোচ্ছে।

তার মানে এ চুক্তি থেকে ফেরার পথ প্রায় বন্ধ। আর এতেই পুরো জাতি পাচ্ছে বিপদের গন্ধ। 

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১৫ মে ২০২৬