তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ইংল্যান্ডের স্কুলে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ২৭ সুপারিশ, প্রশিক্ষণ পাবেন শিক্ষকরা

ইংল্যান্ডের স্কুলে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ২৭ সুপারিশ, প্রশিক্ষণ পাবেন শিক্ষকরা

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২১ অক্টোবর: 

ইংল্যান্ডের স্কুল ও কলেজে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে ২৭টি সুপারিশ তুলে ধরতে যাচ্ছে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি। সাবেক শিক্ষা পরিদর্শক স্যার ডেভিড বেলের নেতৃত্বে পরিচালিত পর্যালোচনায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, হলোকাস্ট শিক্ষা জোরদার, অনলাইনে ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য প্রতিরোধ এবং স্কুলে রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের নীতিমালা পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর প্রতিবেদনটি প্রকাশের কথা রয়েছে। সরকার সুপারিশগুলো গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে উদ্বেগ

পর্যালোচনায় ইংল্যান্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইহুদিবিদ্বেষী আচরণ, হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ যথাযথভাবে সামনে আসে না বলে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জরিপ অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর একজন স্কুলে ইহুদিবিদ্বেষ প্রত্যক্ষ করেছে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, তিন-পঞ্চমাংশ ইহুদি শিক্ষার্থী এমন আচরণের শিকার হয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত পড়াতে প্রশিক্ষণ

পর্যালোচনায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মতো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বিষয় শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিষয়ে স্কুলের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নির্দেশনা আরও স্পষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ফিলিস্তিনপন্থী প্রতীকসহ রাজনৈতিক ব্যাজ বা পরিচয়সূচক চিহ্ন শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের উপযুক্ততা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। তবে এটি সব রাজনৈতিক প্রতীক নিষিদ্ধ করার সুপারিশ নয়; বরং স্কুলের নীতিমালা ও শিক্ষাপরিবেশের আলোকে বিষয়টি বিবেচনার প্রস্তাব।

পর্যালোচনায় যেসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে

  • শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ: ইহুদিবিদ্বেষ শনাক্ত ও মোকাবিলার পাশাপাশি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মতো সংবেদনশীল বিষয় শ্রেণিকক্ষে ভারসাম্যপূর্ণভাবে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ কাজে সহায়ক শিক্ষাসামগ্রীও সরবরাহের সুপারিশ করা হয়েছে।
  • রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নির্দেশনা: আন্তর্জাতিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক বিষয় পড়ানোর ক্ষেত্রে স্কুলের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বিদ্যমান নির্দেশনা আরও স্পষ্ট করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যাজ ও পরিচয়সূচক প্রতীক ব্যবহারের উপযুক্ততাও বিবেচনা করতে হবে।
  • হলোকাস্ট শিক্ষা জোরদার: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির হাতে ইহুদিদের গণহত্যার ইতিহাস পড়ানোর ক্ষেত্রে ইহুদিবিদ্বেষকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ইতিহাসের পাশাপাশি ঘৃণা ও বৈষম্যের পরিণতি সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে।
  • হলোকাস্ট স্মরণ দিবস পালন: ইংল্যান্ডের সব স্কুলে প্রতিবছর ২৭ জানুয়ারি হলোকাস্ট স্মরণ দিবস পালনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণহত্যার ইতিহাস, মানবিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • ইহুদি ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা: ধর্মীয় শিক্ষার অংশ হিসেবে আধুনিক ইহুদি জীবন, ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত জানাতে হবে। পাশাপাশি সিনাগগ পরিদর্শন ও ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
  • অনলাইন বিদ্বেষ মোকাবিলা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য, ঘৃণামূলক প্রচার ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব শনাক্ত করার জন্য শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম-সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। অনলাইনে পাওয়া তথ্য যাচাই এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারণা সম্পর্কে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করার দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
  • স্কুলের সুরক্ষা নীতিমালায় ইহুদিবিদ্বেষ অন্তর্ভুক্ত: স্কুলের অনলাইন নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থী সুরক্ষা নীতিমালায় ইহুদিবিদ্বেষকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মীদের বিরুদ্ধেও ইহুদিবিদ্বেষী আচরণের অভিযোগ উঠলে তা মোকাবিলার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত: ইহুদিবিদ্বেষী হয়রানির শিকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর যথাযথ তদন্ত, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
  • শিক্ষক সংগঠনগুলোর ভূমিকা: শিক্ষক সংগঠনগুলোকে সদস্যদের ইহুদিবিদ্বেষ শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য ও ঘৃণামূলক আচরণ প্রতিরোধে তাদের সহায়তা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
  • স্কুল পরিদর্শকদের জবাবদিহি: ইংল্যান্ডের স্কুল পরিদর্শনকারী সংস্থা অফস্টেডসহ সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকদের স্কুলগুলো ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় গৃহীত নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • ইহুদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা: ইহুদি শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের পথে হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইহুদি স্কুলের আশপাশের পরিবহনকেন্দ্রগুলোতে এ ধরনের প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পর্যালোচনার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিরোধ, অভিযোগের যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা। তবে রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের বিষয়ে প্রস্তাবিত নির্দেশনা ও কার্যকর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।