‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

ইউরোপের আজকের গুরুত্বপূর্ণ খবর

ইউরোপের আজকের গুরুত্বপূর্ণ খবর

ইউরোপ প্রতিনিধি, ২১ অক্টোবর:

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এবং অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের পর এবার ইতালির মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইতালির মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েন, লুটপাটের পর কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা

ইতালির অর্থনৈতিক কেন্দ্র মিলানে কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরটিতে ৫০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার।

ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি মঙ্গলবার জানান, মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেতে যাওয়া নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে সেনা মোতায়েন করা হবে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেনাসদস্যদের বিচারিক পুলিশের কিছু ক্ষমতাও দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গত শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনসেবার মান নিয়ে একটি বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে মিলানের বিভিন্ন এলাকায় একদল বিক্ষোভকারী দোকানপাটের জানালা ভাঙচুর, লুটপাট এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর, বোতল ও অগ্নিসংযোগকারী বস্তু নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।

ইতালির বার্তা সংস্থা আনসার তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে ১৪ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের হিসাবে, মিলানে ২৭০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি।

সরকার অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধ দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সমাবেশ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে ইতালির সরকার বলেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু বিক্ষোভের নামে ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ফ্রান্সে নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা, সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী শনিবার সম্ভাব্য বিক্ষোভ মোকাবিলায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও কাজে লাগানো হবে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু মঙ্গলবার সংসদে বলেন, আসন্ন বিক্ষোভ মোকাবিলায় বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান পরিচালিত হবে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, সেনাবাহিনীর অপারেশন সাঁতিনেল কর্মসূচির আওতায় নিয়োজিত সদস্যদের কিছু স্থির নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হবে। এতে পুলিশ ও জেন্ডারমারি সদস্যরা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ এবং সহিংসতা মোকাবিলায় বেশি সময় দিতে পারবেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষা খাতে অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে প্যারিসের নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় রাতের কারফিউ জারি রাখা হয়েছে। লিয়নের কেন্দ্রীয় এলাকাতেও রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ বহাল রয়েছে।

সরকারের দাবি, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও লুটপাটে বিপুলসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিন্যানশিয়াল টাইমস-এর ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৩ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির শিকার হয়েছে। বীমা খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি থেকে ১২০ কোটি ইউরো বলে অনুমান করা হচ্ছে।

প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিলাসবহুল পণ্যের দোকান ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় কিছু প্রতিষ্ঠান দোকানের জানালা বন্ধ করে দিয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে।

সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে লুট হওয়া পণ্য বিক্রি বন্ধ করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ, বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ

ইতালি ও ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ, সহিংসতা ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেলজিয়ামের বিভিন্ন শহর এবং আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায়ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যানশিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের পাশাপাশি কোথাও কোথাও সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

বেলজিয়ামের কিছু এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, আলবেনিয়ার তিরানায় একটি বিতর্কিত পর্যটন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়।

ইউরোপীয় কমিশন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি সহিংসতা ও ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়েছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের কারণ এক নয়। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয়, কোথাও জনসেবার মান, আবার কোথাও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা স্থানীয় ইস্যু মানুষের ক্ষোভের কারণ। তাই সব বিক্ষোভকে একই দৃষ্টিতে দেখা ঠিক হবে না। তবে অর্থনৈতিক চাপ ও জনঅসন্তোষকে উপেক্ষা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর চাপ বাড়িয়েছেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনকে মার্কিন সহায়তা এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থানে পরিবর্তনের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে।

অন্যদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার বিকল্প পথ খুঁজছে।

যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ইউরোপের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ব্যয়, জ্বালানি পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় পরিবর্তন এলে ইউরোপকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হতে পারে।