তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ব্রিটেনে বাড়ছে ‘আমেরিকান কোভিড’

ব্রিটেনে বাড়ছে ‘আমেরিকান কোভিড’

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২১ অক্টোবর : ব্রিটেনে আবারও বাড়ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘আমেরিকান কোভিড’ নামে পরিচিত এক ধরনের করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট। সংক্রমণের সঙ্গে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হারও বাড়ায় শীতের শুরুতে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গলাব্যথা, কাশি, জ্বর ও কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া এই সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য উপসর্গ। তবে শুধু একটি উপসর্গ দেখে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা ইউকেএইচএসএর (UKHSA) তথ্য অনুযায়ী, ‘আমেরিকান কোভিড’ নামে পরিচিত এক্সএফজি (XFG) ভ্যারিয়েন্টটি নতুন কোনো ভাইরাস নয়। এটি ‘স্ট্র্যাটাস’ নামেও পরিচিত এবং গত প্রায় এক বছর ধরে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে ব্যবহৃত ‘আমেরিকান কোভিড’ নামটি ভাইরাসটির শনাক্তকরণ ও জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত; এর অর্থ এই নয় যে ভাইরাসটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ছড়িয়েছে।

সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তি বাড়ছে

যুক্তরাজ্যে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে ইউকেএইচএসএর অক্টোবরের প্রতিবেদনে। সংস্থাটির ৮ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে হাসপাতালে শনাক্ত হওয়া কোভিড রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭৪। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৮৯-এ। একই সময়ে হাসপাতালে কোভিড শনাক্ত রোগীদের ভর্তি হওয়ার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

তবে পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। হাসপাতালে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দেশের মোট সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র নয়। যারা পরীক্ষা করাচ্ছেন এবং হাসপাতালের নজরদারির আওতায় আসছেন, মূলত তাঁদের তথ্যই এসব পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়। ফলে প্রকৃত সংক্রমণ আরও বেশি হতে পারে।

ইউকেএইচএসএর ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ সাপ্তাহিক নজরদারি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইংল্যান্ডে ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে কোভিডে হাসপাতালে ভর্তির হার বেড়ে ২.৪৬ হয়েছে। আগের সপ্তাহে এই হার ছিল ২.১৩। একই সময়ে নিবিড় পরিচর্যা বা উচ্চপর্যায়ের পরিচর্যা ইউনিটে ভর্তির হার ছিল প্রতি এক লাখে ০.০৬, যা আগের সপ্তাহের সমান।

অর্থাৎ, সাধারণ হাসপাতালে ভর্তির হার বাড়লেও গুরুতর অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যায় ভর্তির হার একই পর্যায়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে কোভিডের সামগ্রিক কার্যক্রমের মাত্রা কম হলেও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।

‘আমেরিকান কোভিডের’ বিশেষ উপসর্গ কী?

এক্সএফজি ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হলে আগের করোনাভাইরাসের ধরনগুলোর মতোই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • গলাব্যথা: গলায় ব্যথা, খুসখুসে অনুভূতি কিংবা খাবার ও পানি গিলতে অস্বস্তি হতে পারে।
  • কণ্ঠস্বর পরিবর্তন: গলা বসে যাওয়া, স্বর কর্কশ হওয়া বা কথা বলতে অস্বস্তি এই সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হতে পারে।
  • কাশি: শুকনো কাশি অথবা অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
  • জ্বর ও শরীর ব্যথা: জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং পেশিতে ব্যথা হতে পারে।
  • নাক দিয়ে পানি পড়া: সর্দি, নাক বন্ধ থাকা এবং হাঁচির মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া বা গলা বসে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচনা হলেও এটি এক্সএফজি ভ্যারিয়েন্টের একমাত্র বা নিশ্চিত শনাক্তকারী উপসর্গ নয়। সাধারণ সর্দি, ফ্লু এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়।

তাই কারও গলাব্যথা বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হলেই তাঁকে ‘আমেরিকান কোভিডে’ আক্রান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। উপসর্গের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে সংক্রমণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে সবার অসুস্থতার মাত্রা এক রকম হয় না। বয়স্ক ব্যক্তি, বিশেষ করে ৭৫ বছরের বেশি বয়সীরা এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদেরও সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর রাখা উচিত।

ইউকেএইচএসএর ১৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইংল্যান্ডে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে কোভিডে হাসপাতালে ভর্তির হার ছিল প্রতি এক লাখে ২৬.৬৯। আগের সপ্তাহে এই হার ছিল ২৪.২০। অর্থাৎ, সবচেয়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি রয়েছে।

তবে এক্সএফজি ভ্যারিয়েন্ট আগের ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় বেশি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ইউকেএইচএসএ। হাসপাতালে ভর্তি বাড়ার পেছনে সামগ্রিক সংক্রমণ বৃদ্ধি, শীতের মৌসুম এবং সময়ের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে আসার মতো কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শীতের শুরুতে কেন বাড়ছে সংক্রমণ?

শীতের দিকে আবহাওয়া ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে হলে মানুষ ঘরের ভেতর বেশি সময় কাটান। কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন, দোকানপাট ও অন্যান্য বদ্ধ জায়গায় মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ বাড়লে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এ ছাড়া আগের সংক্রমণ বা টিকা নেওয়ার পর তৈরি হওয়া সুরক্ষা সময়ের সঙ্গে কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে কিছু মানুষের আবার সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যুক্তরাজ্যে শুধু করোনাভাইরাস নয়, ফ্লু ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের কার্যক্রমও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। এসব সংক্রমণের উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি হওয়ায় শুধু লক্ষণ দেখে কোন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন।

সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় কী করবেন?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

  • করোনার টিকা নেওয়ার যোগ্য হলে এবং টিকা দেওয়ার আমন্ত্রণ পেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টিকা নিন।
  • অসুস্থ বোধ করলে সম্ভব হলে বাড়িতে থাকুন এবং অন্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ কমিয়ে দিন।
  • বয়স্ক বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল ব্যক্তিদের কাছে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।
  • ঘরের ভেতরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করুন।
  • কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখুন এবং নিয়মিত হাত পরিষ্কার করুন।
  • শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) এবং ইউকেএইচএসএর নির্দেশনা অনুসরণ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের টিকা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

ব্রিটেনে করোনার সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তি বাড়ার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে ‘আমেরিকান কোভিড’ নাম শুনেই নতুন কোনো ভয়াবহ ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটেছে—এমন ধারণা করাও ঠিক হবে না। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, এক্সএফজি পরিচিত করোনাভাইরাসের একটি ভ্যারিয়েন্ট এবং এর উপসর্গ আগের ধরনগুলোর সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া। শীতের মৌসুমে সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে ব্যক্তিগত সতর্কতা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলাই এখন সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।