‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৫০ ।। ।। ঘুষের পোশাক ।।
।। ঘুষের পোশাক ।।
উৎসর্গ
সমাজের দুর্নীতির বলি হয়ে যারা নীরবে চোখের জল ফেলে,
এই গল্প তাদের প্রতি।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রানীগাঁও বাজার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও মতি মিয়ার চায়ের দোকানে লোকজনের ভিড়। কারও হাতে চায়ের কাপ, কারও চোখ মোবাইলের পর্দায়। চায়ের দোকানের এক কোণে বসেছিলেন করিম মিয়া। পেশায় দিনমজুর। তাঁর জীবনের হিসাব খুব সহজ—দিনে কাজ পেলে হাঁড়িতে ভাত চড়ে, কাজ না পেলে সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে রাত কাটে। অথচ কয়েক দিন ধরে তিনি এক দুশ্চিন্তায় অস্থির। তাঁর ছেলেকে একটি ঘটনায় জড়িয়ে থানায় নেওয়া হয়েছে। ছেলেটি অপরাধ করেছে কি না, তা তাঁর জানা নেই; কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, নির্দোষ হলে আইনই তাকে রক্ষা করবে।
সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর কথা শোনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল টাকা-পয়সার প্রসঙ্গ। করিম মিয়া বুঝতে পারছিলেন না, বিচার চাইতে এসে তাঁকেই কেন পকেটের হিসাব দিতে হবে।
সেদিন রানীগাঁও বাজারে পুলিশের পোশাক পরা একজন কর্মকর্তাকে সামনে পেয়ে তিনি সাহস করে এগিয়ে গেলেন।
—স্যার, আমার ছেলেটাকে একটু দেখবেন? কোনো অপরাধ করেনি। সকাল থেকে থানায় ঘুরছি, কেউ আমার কথা শুনছে না।
কর্মকর্তা বিরক্ত চোখে তাঁর দিকে তাকালেন।
—আপনি কি মনে করেন, পুলিশে চাকরি করি বলে আমি ঘুষ খাই না? আমি যদি বলি, পুলিশে চাকরি করি কিন্তু ঘুষ খাই না, তাহলে কি আমি বায়তুল মুকাররমের ইমাম সাহেব হয়ে যাব?
করিম মিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কর্মকর্তা এবার নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে প্রায় গর্বের সঙ্গেই বললেন,
—শুনুন, আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই!
কথাটা শুনে আশপাশের লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। কেউ মোবাইল বের করে ভিডিও করতে লাগল, কেউ ফিসফিস করে হাসল। করিম মিয়ার মুখ শুকিয়ে গেল। যে পোশাক দেখে মানুষ আইন ও নিরাপত্তার আশ্বাস খোঁজে, সেই পোশাকের পেছনেই যদি ঘুষের হিসাব থাকে, তাহলে তিনি বিচার চাইবেন কার কাছে?
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
—স্যার, আমরা গরিব মানুষ। আপনাদের কাছে বিচার চাইতে আসি। আপনারাই যদি ঘুষের কথা বলেন, তাহলে আমরা যাব কোথায়?
কর্মকর্তা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন,
—বেশি কথা বলে লাভ নেই। কাজ করাতে হলে খরচ আছে।
করিম মিয়া পকেট থেকে মেয়ের ওষুধ কেনার জন্য রাখা পাঁচশ টাকার নোটটি বের করলেন। কর্মকর্তা টাকাটার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,
—এটা দিয়ে এখন আর ভয় কাটে না।
করিম মিয়া নোটটি মুঠোয় চেপে ধরলেন। তাঁর মনে হলো, শুধু ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য নয়, নিজের অসহায়ত্বেরও যেন একটা দাম দিতে হচ্ছে তাঁকে—আর সেই দাম দেওয়ার সামর্থ্যও তাঁর নেই।
সেদিন খালি হাতে বাড়ি ফিরে তিনি দেখলেন, ছোট মেয়েটি বিছানায় শুয়ে কাঁপছে। কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠলেন—গা পুড়ে যাচ্ছে।
মেয়েটি দুর্বল কণ্ঠে বলল,
—বাবা, ওষুধ এনেছ?
করিম মিয়া মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পকেটে হাত দিলেন। পাঁচশ টাকার নোটটা তখনো আছে। অথচ ওই টাকা দিয়ে মেয়ের ওষুধ কেনার কথা ছিল, ছেলেকে ছাড়ানোর জন্যও টাকাটা কাজে লাগতে পারত। কোন দিকটা বেছে নেবেন, বুঝতে পারলেন না।
স্ত্রী অসহায় চোখে তাকিয়ে বললেন,
—ওর জ্বর বাড়ছে। কিছু একটা করো।
করিম মিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন।
—মা, তোর বাবা গরিব। সত্যি কথা বলার সাহস আছে, কিন্তু সত্যের দাম দেওয়ার সামর্থ্য নেই।
পরদিন ভোরে তিনি মেয়েকে নিয়ে ওষুধের দোকানে ছুটলেন। কিন্তু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু জোগাড় করতে করতে অনেক দেরি হয়ে গেল। মেয়েটির অবস্থার দ্রুত অবনতি হলো। গ্রামের লোকজন ছুটে এল। কেউ পানি আনল, কেউ ডাক্তার ডাকতে গেল। করিম মিয়া মেয়ের ছোট্ট হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ পর হাতটা নিথর হয়ে গেল।
করিম মিয়া প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলেন না। তারপর মেয়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে ডাকলেন,
—মা, ওঠ। তোর ওষুধ এনেছি। দেখ, বাবা ওষুধ এনেছে!
কিন্তু মেয়েটি আর চোখ খুলল না।
সেদিন দুপুরে রানীগাঁও বাজারের চায়ের দোকানে আবার দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হলো। কেউ বলল, তদন্ত হওয়া উচিত। কেউ বলল, দোষ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা ঠিক নয়। কথাগুলো ন্যায়সংগত। অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়া জরুরি, আর কারও বক্তব্যের ভিত্তিতে অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্ন জন্মেছে, তার উত্তর কে দেবে?
দোকানের সামনে নতুন একটি পোস্টারও ঝুলছিল—‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান আপসহীন।’
করিম মিয়া বাজারের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেন। কোলে মেয়ের নিথর দেহ, চোখে পানি নেই। যেন কাঁদার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন।
বৃদ্ধ এক দোকানি ছুটে গিয়ে তাঁর পথ আটকালেন।
—করিম, কী হয়েছে?
করিম মিয়া থামলেন। শুকনো ঠোঁট দুটো কাঁপল।
—মেয়েটা আর নেই, চাচা।
বৃদ্ধ নির্বাক হয়ে গেলেন।
করিম মিয়া একবার চায়ের দোকানের দিকে, একবার পোস্টারের দিকে তাকালেন। তারপর এমন এক হাসি হাসলেন, যে হাসি দেখে বৃদ্ধের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
—চাচা, আমার মেয়েটা তো কোনো অপরাধ করেনি। ওর বিচারটা কে করবে?
বৃদ্ধের মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না।
করিম মিয়া আবার হাঁটতে শুরু করলেন। পেছনে চায়ের দোকানে তখন কেউ একজন বলছিল,
—দেশটা দুর্নীতিতে ভরে গেছে!
আরেকজন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
—কিন্তু দুর্নীতি বন্ধ করবে কে?
কেউ উত্তর দিল না।
শুধু পোস্টারটা বাতাসে দুলছিল।
আর করিম মিয়া মেয়েকে বুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন—এমন এক সমাজের ভেতর দিয়ে, যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার মানুষ অনেক, কিন্তু দুর্নীতির কারণে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ বড়ই কম।
যে সমাজে ঘুষ দিয়ে পোশাক কেনার কথা প্রকাশ্যে বলা যায়, অথচ গরিব বাবাকে সন্তানের চিকিৎসার টাকা আর ন্যায়বিচারের দাবির মধ্যে বেছে নিতে হয়, সেখানে দুর্নীতি শুধু অপরাধ নয়—এ এক নির্মম মানবিক বিপর্যয়।
লন্ডন, ২১ অক্টোবর, ২০২৬