বাংলাদেশ সংবাদ

দেশে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক কুশ: সেবন করলে থাকে না হুশ

দেশে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক কুশ: সেবন করলে থাকে না হুশ

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৩ আগস্ট:

বাংলাদেশে নতুন ধরনের মাদক ‘কুশ’ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একসময় দেশে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত এই মাদক গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে আকাশপথ ও সীমান্ত দিয়ে কুশের একাধিক চালান দেশে ঢোকার তথ্যও সামনে এসেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসেই কুশের তিনটি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কয়েকজন বিদেশি নাগরিকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের ধারণা, আন্তর্জাতিক একটি চক্র থাইল্যান্ড থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে মাদকটি আনছে। পরে দেশীয় সহযোগীদের মাধ্যমে তা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সাধারণ গাঁজার চেয়ে বেশি তীব্র

ডিএনসি কর্মকর্তারা বলছেন, কুশ মূলত বিশেষ জাতের গাঁজার ফুল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয়। এতে টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC) নামের মনোপ্রভাবকারী উপাদান থাকে। সাধারণ গাঁজার তুলনায় কুশে THC-এর ঘনত্ব অনেক বেশি হতে পারে। ফলে এর প্রভাবও তুলনামূলকভাবে তীব্র।

কুশ শুধু প্রচলিতভাবে ধূমপানের মাধ্যমে নয়, বিভিন্ন খাবার ও ভ্যাপজাত পণ্যের মাধ্যমেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কেক, চকলেট, চুইংগাম এবং ই-সিগারেট বা ভ্যাপের মধ্যেও THC-যুক্ত উপাদান পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, THC মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে স্মৃতি ও মনোযোগে সমস্যা, বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা কমে যাওয়া, উদ্বেগ, আতঙ্ক, বিভ্রান্তি এবং আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারে গুরুতর মানসিক ও শারীরিক সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

এক মাসে তিন চালান

সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ কুশ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ১৮ আগস্ট প্রায় ৪ কেজি ১০০ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। এর আগে গত ২৪ জুলাই আরও বড় একটি চালান থেকে প্রায় ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করে ডিএনসি।

সর্বশেষ বিমানবন্দরে এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে প্রায় ৩ কেজি কুশ উদ্ধার করা হয়েছে। ডিএনসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি কুশের বাজারমূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক কেজির একটি চালানের মূল্যই কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।

এ ছাড়া গত ৬ আগস্ট সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১২ কেজি কুশ উদ্ধারের তথ্যও পাওয়া গেছে।

তদন্তে ভারতীয় নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশি কয়েকজন সহযোগীর নামও সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, বিদেশি চক্রের সদস্যরা দেশে এসে চালান হস্তান্তর করে ফিরে যায়। এরপর দেশীয় নেটওয়ার্কের সদস্যরা মাদকটি বিভিন্ন ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়।

উদ্বেগ স্কুলশিক্ষার্থীদের নিয়েও

কুশের বিস্তার শুধু বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এমন তথ্যও পেয়েছে ডিএনসি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এর ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।

চলতি বছরের ২৬ মে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক নারী চিকিৎসক ও তাঁর ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ৫৯টি ইলেকট্রিক ভ্যাপ উদ্ধার করা হয়, যার কয়েকটিতে কুশের প্রধান মনোপ্রভাবকারী উপাদান THC ছিল বলে তদন্তকারীরা জানান।

ডিএনসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী চিকিৎসক জানান, ছেলের আবদারে বিদেশ থেকে ভ্যাপগুলো কেনা হয়েছিল।

এই ঘটনা অভিভাবকদের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। বাহ্যিকভাবে সাধারণ ভ্যাপ বা ই-সিগারেটের মতো দেখতে কোনো পণ্যের ভেতরে মাদকজাত উপাদান থাকতে পারে।

দেশে উৎপাদনেরও চেষ্টা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, কুশ এখন শুধু বিদেশ থেকে আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশেও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এটি উৎপাদনের চেষ্টা ধরা পড়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর ওয়ারীতে কুশ উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য তৈরি একটি ল্যাবরেটরি শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, মাদক ব্যবসায়ীরা শুধু বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের পথও খুঁজছে।

এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রথম কুশ জব্দের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছিল, বিদেশফেরত এক ব্যক্তি কুশসহ বিভিন্ন মাদক নিয়ে গবেষণা ও উৎপাদনের জন্য ল্যাব স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।

দরকার সমন্বিত প্রতিরোধ

কুশের বিস্তার ঠেকাতে শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিমানবন্দর ও সীমান্তে নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি মাদকটির ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন করতে হবে।

বিশেষ করে ভ্যাপ, ই-সিগারেট, কেক, চকলেট বা চুইংগামের মতো পরিচিত পণ্যের আড়ালে মাদক ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত তরুণদের কেবল অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কুশের বাজার যত বিস্তৃত হবে, ততই নতুন প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি বাড়বে। তাই শুরুতেই এর আন্তর্জাতিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক, দেশীয় পরিবেশক ও স্থানীয় উৎপাদনের চেষ্টা বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আরও বড় মাদক সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।