বাংলাদেশ সংবাদ

এলডিসি উত্তরণে আরও সময় চাইল বাংলাদেশ, সামনে অর্থনৈতিক প্রস্তুতির বড় চ্যালেঞ্জ

এলডিসি উত্তরণে আরও সময় চাইল বাংলাদেশ, সামনে অর্থনৈতিক প্রস্তুতির বড় চ্যালেঞ্জ

ঢাকা, ২৩ আগস্ট: স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে আরও সময় দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় এই সময় চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের নির্ধারিত সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, ওষুধশিল্পে বিশেষ সুবিধা হারানো এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি উত্তরণ নিজেই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক অর্জন। কিন্তু প্রস্তুতি দুর্বল থাকলে এই অর্জন অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি আয়ের বড় অংশ একটি মাত্র খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঝুঁকি রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মৎস্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্যটনের মতো সম্ভাবনাময় খাত থাকলেও এসব ক্ষেত্রে রপ্তানি বহুমুখীকরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় এগোয়নি।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ফলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শুল্ক সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে বর্তমানে পাওয়া অগ্রাধিকারমূলক ও শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার একটি অংশ হারাতে পারে। বিভিন্ন প্রাক্কলন অনুযায়ী, এর ফলে বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা এবং কম সুদের বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগও সীমিত হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের আরেকটি বড় উদ্বেগ ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সস্তা শ্রমনির্ভর প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেলে প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি, উৎপাদনশীলতা ও নতুন রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার না হলে দীর্ঘ সময় মধ্যম আয়ের স্তরে আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এখন জরুরি। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সুযোগ পাওয়া গেলে সেটিকে কেবল সময়ক্ষেপণের মাধ্যম হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তবে উত্তরণের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে পারে, বৈদেশিক বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ঋণ ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এলডিসি থেকে উত্তরণকে শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সুফল ধরে রাখতে হলে অর্থনীতির ভিত শক্ত করা, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য চাপের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।