তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
ভয়াবহ এল নিনো, ছয় মাসে সাড়ে চার লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৩ সেপ্টেম্বর :
প্রকৃতির একটি পরিচিত জলবায়ু প্রবাহ এবার যেন ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীদের নতুন এক পূর্বাভাস বলছে, চলমান শক্তিশালী ‘এল নিনো’র কারণে আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত তাপজনিত প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উষ্ণ ও তুলনামূলক দরিদ্র দেশগুলো।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব-এর গবেষকদের হিসাবের ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। গবেষণায় সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপের কারণে সম্ভাব্য মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে। চলমান এল নিনো জুনে শুরু হওয়ার পর এরই মধ্যে যে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু ঘটেছে বলে গবেষকেরা অনুমান করছেন, সেটিও মোট হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

গবেষকদের হিসাবে, সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে। জুন থেকে হিসাব করলে মোট সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। তবে এই সংখ্যা একটি পূর্বাভাস—এল নিনোর তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার গতিপথ পরিবর্তিত হলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। আগামী ছয় মাসে শুধু নাইজেরিয়াতেই ৩০ হাজারের বেশি অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৯ হাজার, ভারতে ১৬ হাজার এবং ব্রাজিলে প্রায় ১৩ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ঝুঁকির বাইরে নয়; দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
এল নিনো শুধু তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় না। এর প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, দাবানল ও বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। খাদ্য উৎপাদন ও পানির সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এর আগে সতর্ক করেছিল, এল নিনোর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ অতিরিক্ত খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারেন এবং খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে বয়স্ক মানুষ, ছোট শিশু এবং এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাদের পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা বা অতিরিক্ত গরম থেকে আশ্রয়ের সুযোগ কম। তাই আগাম তাপ সতর্কতা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র, পর্যাপ্ত পানি, হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত প্রস্তুতি এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষার মতো ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—এল নিনো নিজে একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা হলেও এবার এটি এমন একটি পৃথিবীতে আঘাত করছে, যার গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক বেশি। ফলে একই মাত্রার এল নিনোর প্রভাব অতীতের তুলনায় আরও তীব্র হতে পারে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটোও সতর্ক করেছেন, উষ্ণতর বৈশ্বিক তাপমাত্রার ভিত্তির ওপর এল নিনো যুক্ত হওয়ায় অনেক অঞ্চলে নজিরবিহীন তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ফেব্রুয়ারির পরও ঝুঁকি শেষ হওয়ার কথা নয়। বর্তমান পূর্বাভাস ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হলেও এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সালের জুন বা জুলাই পর্যন্ত তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে রাখতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। অর্থাৎ সামনে শুধু একটি গরম মৌসুম নয়, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তার জন্য একটি বড় পরীক্ষার সময় অপেক্ষা করছে।
বিজ্ঞানীদের এই পূর্বাভাস তাই কেবল মৃত্যুর একটি সম্ভাব্য সংখ্যা নয়; এটি আগাম সতর্কবার্তাও। সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়া গেলে অতিরিক্ত তাপের কারণে বহু প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।