বিশ্ব সংবাদ

মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি, পৃথিবীর পরিণতি কী হবে?

মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি, পৃথিবীর পরিণতি কী হবে?

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১৭ সেপ্টেম্বর:

মহাকাশকে এতদিন বিজ্ঞান, যোগাযোগ ও গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হলেও এখন সেটিই পরিণত হচ্ছে সামরিক প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানিয়েছে, পৃথিবীর কক্ষপথে তাদের ‘স্পেস কন্ট্রোল উইপন’ বা মহাকাশ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের জন্য অস্ত্র মোতায়েন রয়েছে। এর পরপরই চীন ও রাশিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—মহাকাশে সত্যিই যুদ্ধ শুরু হলে তার ধাক্কা কতটা পৌঁছাবে পৃথিবীর মানুষের জীবনে?

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী সচিব ট্রয় মেইঙ্ক ১৫ সেপ্টেম্বর জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী কক্ষপথে এমন অস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে, যা সম্ভাব্য শত্রুর মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা মোকাবিলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অস্ত্রগুলোর ধরন, সংখ্যা বা নির্দিষ্ট সক্ষমতা প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন মহাকাশবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহাকাশ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত সক্ষমতার মধ্যে ধ্বংসাত্মক ও অ-ধ্বংসাত্মক—দুই ধরনের প্রযুক্তিই থাকতে পারে।

এই ঘোষণার পর চীন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপ মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিতে পারে। রাশিয়াও নতুন করে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তির আহ্বান জানিয়েছে। রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেছেন, এখনো মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা একেবারে নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া বহু বছর ধরে স্যাটেলাইটকে অচল বা অকার্যকর করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্ষপথে কাছাকাছি গিয়ে অন্য স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, জ্যামিং, লেজার প্রযুক্তি, সাইবার আক্রমণ এবং কক্ষপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম মহাকাশযান নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে মহাকাশযুদ্ধের জন্য সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতার কথা উঠে এসেছে।

ন্যাটোর কাছেও মহাকাশ এখন সরাসরি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। জোটটি মহাকাশকে স্থল, সমুদ্র, আকাশ ও সাইবার ক্ষেত্রের পাশাপাশি একটি ‘অপারেশনাল ডোমেইন’ হিসেবে বিবেচনা করছে। ন্যাটোর তথ্য অনুযায়ী, যোগাযোগ, নেভিগেশন, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগাম সতর্কতা, গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক কমান্ড—সব ক্ষেত্রেই স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সক্রিয় স্যাটেলাইটগুলোর অর্ধেকেরও বেশি ন্যাটো সদস্য দেশ বা তাদের ভূখণ্ডভিত্তিক কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এর অর্থ হলো, মহাকাশে কোনো বড় সংঘাত হলে তার প্রভাব শুধু সামরিক বাহিনীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। জিপিএস, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, বিমান ও জাহাজ চলাচল, জরুরি যোগাযোগ, ব্যাংকিং এবং ইন্টারনেটের বিভিন্ন অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ন্যাটো নিজেই বলছে, মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্ভরশীল সেবাগুলোতেও দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে।

সবচেয়ে বড় বিপদের একটি হলো মহাকাশের আবর্জনা। কোনো স্যাটেলাইট ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা হলে অসংখ্য ধাতব টুকরো কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জাতিসংঘের মহাকাশবিষয়ক দপ্তর বলছে, এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ মহাকাশের আবর্জনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে আরও সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এখানেই আসে ‘কেসলার সিনড্রোম’-এর আশঙ্কা। নাসার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি স্যাটেলাইট বা মহাকাশযানের সঙ্গে আবর্জনার সংঘর্ষ হলে নতুন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়। সেই ধ্বংসাবশেষ আবার অন্য বস্তুতে আঘাত করলে আরও আবর্জনা তৈরি হতে পারে। এভাবে ধারাবাহিক সংঘর্ষ চলতে থাকলে কোনো নির্দিষ্ট কক্ষপথ ভবিষ্যতে ব্যবহার করা কঠিন বা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে? ১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী পৃথিবীর কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র বা অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ। চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুকে সামরিক ঘাঁটি বা অস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্র বানানোর বিরুদ্ধেও চুক্তিতে বিধান রয়েছে। তবে প্রচলিত সব ধরনের অস্ত্র মহাকাশে রাখার বিষয়ে চুক্তিটি একই মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় না। ফলে আধুনিক অ্যান্টি-স্যাটেলাইট বা অন্যান্য প্রচলিত মহাকাশ অস্ত্র নিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় মহাকাশযুদ্ধের অর্থ শুধু মহাকাশে দুটি দেশের স্যাটেলাইটের লড়াই নয়। একটি সংঘর্ষের প্রভাব পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহন, অর্থনীতি, সামরিক নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর যদি বড় আকারে স্যাটেলাইট ধ্বংস শুরু হয়, তাহলে সমস্যাটি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—কারণ তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষ নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও পরিচালনাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

মহাকাশ তাই আর কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগার নয়; এটি এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি, চীন-রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া এবং ন্যাটোর নতুন মহাকাশ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে প্রতিযোগিতা দ্রুত এগোচ্ছে। এখন বড় প্রশ্ন যুদ্ধ হবে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—যুদ্ধের আগেই বিশ্বশক্তিগুলো মহাকাশকে নিরাপদ রাখার জন্য কতটা কার্যকর নিয়ম ও পারস্পরিক আস্থার ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।