তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনা: ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আওয়ামী লীগ নয়, গণতন্ত্রের পক্ষ নিতে বলছি’

ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনা: ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আওয়ামী লীগ নয়, গণতন্ত্রের পক্ষ নিতে বলছি’

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৩ অক্টোবর :

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাজনৈতিক সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গত ১৯ অক্টোবর ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যটি ২১ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

এটি আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শেখ হাসিনার বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি বাংলা ভাবানুবাদ ও সারসংক্ষেপ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য

মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী থেকে কথা বলার সুযোগ পেয়ে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন, তাঁদের সামনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরাই তাঁর উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, তিনি শুধু বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, দেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ একজন নাগরিক হিসেবেও কথা বলছেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে তিনি গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, জলবায়ু কার্যক্রম, বাণিজ্য ও মানবিক নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের অংশগ্রহণের দাবি

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো পক্ষ বেছে নিতে বলছেন না। তিনি চান, বাংলাদেশকে বিশ্বের সর্বজনীন গণতান্ত্রিক নীতির আলোকে মূল্যায়ন করা হোক। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সাংবিধানিক শাসন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং আইনের চোখে সবার সমান অধিকার।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সরকারের জবাবদিহি থাকা উচিত। কিন্তু ভিন্নমতকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক দলকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া কিংবা লাখ লাখ নাগরিকের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হলে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।

আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক পরিসর থেকে মুছে ফেলা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর সরকারের বিরোধীদের অধিকারও সম্মান করার কথা বলেন।

শেখ হাসিনার ভাষায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের পরিবর্তে সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান কিংবা অঞ্চল নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই প্রভাবের সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। তবে সেই দায়িত্ব বাংলাদেশের শাসক কে হবেন, তা নির্ধারণ করা নয়; বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক ব্যবস্থা, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান, বঙ্গোপসাগর ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এর ভূমিকা এবং মার্কিন বাজারের সঙ্গে যুক্ত লাখো মানুষের জীবিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিকে অভিন্ন স্বার্থ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার পক্ষে মত দেন শেখ হাসিনা। তিনি মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ গভীর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

একই সঙ্গে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেন তিনি।

তাঁর মতে, বাংলাদেশ বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত না হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

২০২৪ সালের ঘটনা ও বিচারপ্রক্রিয়া

নিজের সরকারের ভূমিকা, ২০২৪ সালের ঘটনাবলি এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে কঠিন প্রশ্ন রয়েছে বলে স্বীকার করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি প্রস্তুত।

নিজের বিরুদ্ধেও যেকোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে নয়, স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, স্বজন হারানো পরিবার, বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তিদের পাশাপাশি অভিযুক্তদেরও ন্যায়সংগত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; আর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ন্যায়বিচারও নিশ্চিত হয় না।

উন্নয়ন ও গণতন্ত্র—দুটিই প্রয়োজন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের উন্নয়নের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, তাঁর সরকারের মূল্যায়ন যেভাবেই হোক, বাংলাদেশের এই পরিবর্তনগুলোও ইতিহাসে বিবেচিত হবে।

তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, উন্নয়নের অজুহাতে গণতন্ত্র সীমিত করা উচিত নয়। আবার গণতন্ত্রের নামে উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও সমর্থনযোগ্য নয়।

তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র ও উন্নয়ন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সমঝোতা—সবকিছুর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শক্তিশালী ব্যক্তির পরিবর্তে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

বাংলাদেশি-আমেরিকানদের ভূমিকা

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অবদান উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশি-আমেরিকানরা উদ্যোক্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, শ্রমজীবী মানুষ ও কমিউনিটি নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন।

তাঁদের দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রত্যাশা জানান। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব কোনো সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনৈতিক মতবিরোধের চেয়ে বড় এবং এই বন্ধুত্ব টিকে থাকা প্রয়োজন।

ওয়াশিংটনের প্রতি শেখ হাসিনার সাত দফা আহ্বান

বক্তব্যের শেষাংশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কয়েকটি বিষয়ে সমর্থন চেয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর আহ্বানগুলো হলো—

১. অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা।

২. স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানানো।

৩. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা।

৪. রাজনৈতিক সংগঠন ও সমিতি গঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

৫. সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা।

৬. যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

৭. অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগকে বেছে নিতে বলছেন না; বরং গণতন্ত্রের পক্ষ নিতে আহ্বান জানাচ্ছেন। বাংলাদেশের সরকার কে হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশের মানুষের। তাঁরা যেন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের সরকার বেছে নিতে পারেন—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।