ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

চাকরির টোপে রাশিয়া, গন্তব্য যুদ্ধের ময়দান, পরিণামে মৃত্যু!

চাকরির টোপে রাশিয়া, গন্তব্য যুদ্ধের ময়দান, পরিণামে মৃত্যু!

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৩ অক্টোবর :

রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের—এমন অভিযোগে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। চাকরির আশায় দেশ ছেড়ে যাওয়া তরুণদের কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ গুরুতর আহত হয়ে দেশে ফিরেছেন, আবার অনেকে এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ায় কাজের প্রস্তাব গ্রহণের আগে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন এবং চাকরি ও নিয়োগকর্তার সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) তদন্তের বরাত দিয়ে ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্মাণকাজের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নেওয়ার পর রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে তদন্তকারী ইউনিট। বলা হয়েছে, তাঁদের ১৭ জন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই শ্রমিকদের মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া এবং প্রতিশ্রুত চাকরির পরিবর্তে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বাকি ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আহত হয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং কয়েকজন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাকরির নামে প্রতারণা, মাথাপিছু প্রায় ১০ লাখ টাকা

এসআরবির তদন্ত অনুযায়ী, ওই ৩০ জনকে নির্মাণকাজের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাঠাতে কয়েকটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। দেশে ফিরে আসা আহত এক শ্রমিকের পরিবারের করা মানবপাচারের অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে এ তথ্য সামনে আসে। এ ঘটনায় দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

২১ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের পরিবারের অনেকেই এখন স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত। কেউ জমি-সম্পদ বিক্রি করেছেন, কেউ স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেছেন, আবার কেউ ঋণ করে বিদেশে যাওয়ার খরচ জুগিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারকে সচ্ছল করবেন; কিন্তু সেই স্বপ্নের বদলে অনেক পরিবার পেয়েছে স্বজনের মৃত্যুসংবাদ ও অনিশ্চয়তা।

শুধু ৩০ জনের ঘটনা নয়

বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে যুক্ত করার অভিযোগ আরও আগে থেকেই সামনে আসছিল। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত একটি মানবাধিকারভিত্তিক অনুসন্ধানে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শতাধিক বাংলাদেশিকে রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে এবং তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে গত তিন বছরে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে অন্তত ৫৪ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবরের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা বিভিন্ন অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত; সব মৃত্যুর সরকারি নিশ্চিত হিসাব এক নয়।

বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাকরির কথা বলে শ্রমিকদের রাশিয়ায় পাঠিয়ে পরে যুদ্ধে যুক্ত করার অভিযোগে তিনটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা এবং রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

কেন রাশিয়ায় যাওয়ার আগে বিশেষ সতর্কতা জরুরি

প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, তাঁদের কারও কাছে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কারখানার শ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মী কিংবা নির্মাণশ্রমিকের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর এমন ভাষায় চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়, যা তাঁরা বুঝতে পারেননি বলে অভিযোগ। এরপর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। কেউ আপত্তি জানালে মারধর, কারাবাস কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এখানে সতর্কতার বিষয়টি শুধু রাশিয়ার ভিসা বা চাকরির কাগজপত্রের বৈধতা যাচাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বৈধ ভিসা বা সরকারি ছাড়পত্র থাকলেই বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ পাওয়া কিংবা নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। তাই চাকরির প্রকৃতি, নিয়োগকর্তা, কর্মস্থল, চুক্তির ভাষা, বেতন এবং কাজের অনুমতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকিও অত্যন্ত গুরুতর। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নির্দিষ্ট তদন্তগুলোর মূল অভিযোগ হলো, বাংলাদেশিদের বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে রুশ সামরিক বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বাধ্যতামূলক নিয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত—এমন দাবি করার মতো সমপর্যায়ের তথ্য এই প্রতিবেদনের সূত্রগুলোতে নেই।

প্রবাসে যাওয়ার আগে যা করবেন

রাশিয়া বা ইউক্রেন-সংলগ্ন অঞ্চলে কাজের প্রস্তাব পেলে শুধু দালাল বা পরিচিত ব্যক্তির আশ্বাসে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে নিয়োগকর্তা ও চাকরির তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো চুক্তি না বুঝে স্বাক্ষর করা, পাসপোর্ট অন্যের কাছে জমা দেওয়া কিংবা চাকরির নামে সামরিক দায়িত্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে প্রস্তাবটি গ্রহণ না করে কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা দূর করার আশায় বিদেশে যাওয়া একজন শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই প্রতারণার ফাঁদে পড়া উচিত নয়। রাশিয়া বা ইউক্রেন-সংলগ্ন এলাকায় চাকরির নামে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি যাচাই না করে যাত্রা করা একজন কর্মীকে শুধু নয়, তাঁর পুরো পরিবারকেও বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে।