আরাফাতের ময়দানে আজ হাজিরার শীর্ষ মুহূর্ত: ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখর আকাশ-ভূমি

আরাফাতের ময়দানে আজ হাজিরার শীর্ষ মুহূর্ত: ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখর আকাশ-ভূমি

সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর , ভয়েস অব পিপল: 

পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোটি মুসলমানের হৃদয় ও কণ্ঠ এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে—আরাফাতের ময়দান-এ। সেলাইবিহীন সাদা ইহরামের কাপড়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজিরা আজ উচ্চারণ করছেন সেই চিরন্তন আহ্বান—“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”

“আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার”—এই ধ্বনিতে আজ প্রকম্পিত হচ্ছে আরাফাতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। যেন আকাশ-ভূমির মাঝখানে মানুষের আত্মা ফিরে যাচ্ছে তার স্রষ্টার দিকে।

হজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় মিনা থেকে। ৮ জিলহজ থেকেই মূল কার্যক্রম শুরু হলেও এর আগের রাতেই বহু হাজি তাঁবুর শহর মিনায় পৌঁছে যান। কেউ গাড়িতে, কেউ পায়ে হেঁটে—মক্কা নগরীর মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরের এই তাঁবু নগরীতে জমায়েত হন লাখো মানুষ।

বাংলাদেশ থেকে এ বছর ৭৯ হাজারের বেশি হাজিও রয়েছেন এই বিশাল সমাগমে। তাঁবুর ভেতর দিন-রাত কেটেছে ইবাদত, জিকির আর তালবিয়াতে। “লাব্বাইক” ধ্বনিতে পুরো মিনার পরিবেশ যেন এক আধ্যাত্মিক শহরে রূপ নিয়েছে।

আজ সূর্যোদয়ের পর হাজিদের রওনা হওয়ার কথা ছিল আরাফাতের দিকে। তবে অনেককেই আগেভাগেই নিয়ে যাওয়া

হয় দায়িত্বপ্রাপ্ত মোয়াল্লিমদের তত্ত্বাবধানে। আরাফাতে না পৌঁছালে হজ পূর্ণ হয় না—এ কারণেই অসুস্থ হাজিদেরও অ্যাম্বুলেন্সে করে এখানে আনা হয়।

ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, আরাফাতের ময়দান হলো সেই স্থান, যেখানে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। এখানকার এক প্রান্তে অবস্থিত জাবালে রহমত—যাকে বলা হয় রহমতের পাহাড় বা দোয়ার পাহাড়। বিশ্বাস করা হয়, এখানেই মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) পুনর্মিলনের পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।

এই বিশাল সমতল ভূমিতে আজ একটাই দৃশ্য—সাদা কাপড়ে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা। কারও মুখে জিকির, কারও চোখে নীরবতা, কারও কণ্ঠে অনুতাপের স্বর।

আজ আরাফাতের কেন্দ্রবিন্দু মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা প্রদান করবেন মসজিদে নববির প্রধান ইমাম শায়েখ আলি বিন আবদুর রহমান আল-হুযাইফি। সেই খুতবার বাংলা অনুবাদও শোনাবেন একদল আলেম, যারা দীর্ঘদিন উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন।

সূর্যাস্তের পর হাজিরা রওনা হবেন মুজদালিফা-এর দিকে, যেখানে রাতযাপন ও পাথর সংগ্রহের মধ্য দিয়ে পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কুরবানি, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, মাথা মুণ্ডন ও তাওয়াফের মাধ্যমে শেষ হবে হজের আনুষ্ঠানিকতা।

তবে এবারের হজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনা, বৈশ্বিক উদ্বেগ এবং তীব্র তাপপ্রবাহ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন। সৌদি আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আরাফাতের দিন তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।

তাপ থেকে সুরক্ষায় সৌদি সরকার ছায়াযুক্ত শেড, কৃত্রিম কুয়াশা তৈরি করা ফ্যান, পর্যাপ্ত পানি ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রেখেছে। হাজিদের ছাতা ব্যবহার ও পানি গ্রহণে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

এবারের হজ ব্যবস্থাপনায় কঠোর করা হয়েছে নুসুক কার্ড ব্যবস্থাও। অনুমতি ছাড়া কাউকে পরিবহন বা হজ কার্যক্রমে সহায়তা করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে আজ আরাফাত শুধু একটি ভূগোল নয়—এটি মানবজাতির আত্মসমর্পণের প্রতীক। যেখানে ধনী-গরিব, ভাষা-জাতি, রাষ্ট্র-সীমা সব মুছে গিয়ে একটাই পরিচয়—“আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির।”