বাংলাদেশ সংবাদ
ঘুষের অঙ্ক ১৩ কোটি টাকা! দুই দিনেই ৮০৪ অভিযোগে উঠে এল দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৫ আগস্ট:
সরকারি সেবা পেতে ঘুষের দাবির অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। কিন্তু এবার সেই বিচ্ছিন্ন অভিযোগগুলো একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জমা হতে শুরু করেছে। আর সেখানেই উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এক হিসাব—মাত্র দুই দিনে ৮০৪টি অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইটে নাম-পরিচয় গোপন রেখে নাগরিকেরা সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন। উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চালুর প্রথম দুই দিনেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত অভিযোগ জমা পড়ে।
অভিযোগের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা। রাজধানী বিভাগ থেকে এসেছে ৪৩০টি অভিযোগ। এরপর চট্টগ্রাম থেকে ১৬৭টি, রাজশাহী থেকে ৪৪টি, খুলনা থেকে ৪৩টি, সিলেট থেকে ৩৮টি, রংপুর থেকে ৩৭টি, ময়মনসিংহ থেকে ৩০টি এবং বরিশাল থেকে ১৫টি অভিযোগ জমা হয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, অভিযোগকারীদের একটি অংশ ঘুষের দাবি মেনে নেননি। মোট অভিযোগকারীর প্রায় ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন।
কোন সেবায় কত ঘুষ চাওয়া হয়—তৈরি হবে নাগরিকদের রেকর্ড
সাইটটিতে অভিযোগ দিতে দপ্তরের নাম, কী ধরনের সেবা নিতে গিয়েছিলেন, কোন এলাকায় ঘটনা ঘটেছে, কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এসব তথ্য দিতে হয়। সঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে ঘটনার বিবরণও লেখা যায়।
অভিযোগ করতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তির নাম, পদবি কিংবা ফোন নম্বর প্রকাশের সুযোগও রাখা হয়নি। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সরাসরি অভিযুক্ত করার পরিবর্তে কোন সরকারি দপ্তর বা সেবা ঘিরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি—সেই সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
অভিযোগ জমা পড়ার পর তা সরাসরি প্রকাশ করা হয় না। মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দেওয়া হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা নীতিমালাবহির্ভূত তথ্যও বাদ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
অভিযোগ আছে, কিন্তু সবই এখনো অযাচাইকৃত
ওয়েবসাইটটির তথ্য ব্যবহারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জমা পড়া অভিযোগগুলো আলাদাভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে না। প্রকাশিত অভিযোগের সঙ্গে ‘আনভেরিফায়েড’ বা অযাচাইকৃত হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
তাই ৮০৪টি অভিযোগ কিংবা ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার অঙ্ককে প্রমাণিত দুর্নীতির হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত নাগরিকদের স্বেচ্ছায় দেওয়া অভিজ্ঞতার একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের এই উদ্যোগ কোনো তদন্ত সংস্থার বিকল্প নয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্বও তারা নিতে চায় না। বরং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় এনে এমন একটি চিত্র তৈরি করতে চায়, যা দেখে বোঝা যাবে—কোন সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকেরা সবচেয়ে বেশি অনৈতিক অর্থদাবির অভিযোগ করছেন।
ঘুষের বিরুদ্ধে নতুন ধরনের নাগরিক উদ্যোগ?
সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফের প্রতিষ্ঠিত এই প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে নিজেদের অর্থেই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন এখন পর্যন্ত নেই।
উদ্যোক্তাদের আশা, সরকারি সেবা নিতে যাওয়ার আগে কোনো নাগরিক যদি অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকে সম্ভাব্য ঘুষের দাবি সম্পর্কে জানতে পারেন, তাহলে তিনি হয়তো অন্যায্য অর্থদাবির বিরুদ্ধে আরও সচেতন ও প্রস্তুত থাকতে পারবেন।
দুই দিনের তথ্যই অবশ্য বাংলাদেশের সামগ্রিক দুর্নীতির চিত্র প্রমাণ করে না। কারণ অভিযোগগুলো যাচাইকৃত নয় এবং ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও সীমিত। তারপরও এত অল্প সময়ে ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়া একটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—সরকারি সেবা পেতে ঘুষের অভিজ্ঞতা কি সত্যিই এত ব্যাপক, নাকি মানুষের কাছে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ কোনো সহজ প্ল্যাটফর্ম এত দিন ছিল না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু অনলাইনে অভিযোগ জমা হলেই চলবে না; অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্ট সেবা ও দপ্তর বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। না হলে ঘুষের অভিযোগের অঙ্ক বাড়বে, ওয়েবসাইটের ডেটাও বাড়বে—কিন্তু বদলাবে না সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার বাস্তবতা।