স্বাস্থ্য সংবাদ

শুধু কী খাচ্ছেন নয়, কখন খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু কী খাচ্ছেন নয়, কখন খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্য ডেস্ক, ২৫ আগস্ট:

সুস্থ থাকার জন্য খাবারের মান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাবার খাওয়ার সময়ও শরীরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩১ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় এমনই একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, খাবারের সময় সরাসরি আয়ু কমায় বা বাড়ায়—এমন কারণ-প্রমাণ এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

European Journal of Clinical Nutrition-এ প্রকাশিত গবেষণাটিতে ১৯৯৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের National Health and Nutrition Examination Survey (NHANES)-এ অংশ নেওয়া ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩১ হাজার ৪৪ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা তাঁদের প্রথম ও শেষ ক্যালরি গ্রহণের সময়ের সঙ্গে পরবর্তী মৃত্যুর তথ্য মিলিয়ে দেখেন।

গড়ে ৮ দশমিক ৬ বছর পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭ হাজার ১২৯ জন মারা যান। তাঁদের ২ হাজার ২৫৯ জনের মৃত্যু ছিল হৃদ্‌রোগজনিত।

দেরিতে প্রথম খাবার, বেশি ঝুঁকি

গবেষণায় দেখা যায়, দিনের প্রথম খাবার যত দেরিতে খাওয়া হয়েছে, মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে তত বেশি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম খাবার গ্রহণকারীদের তুলনায় সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল ১০ শতাংশ বেশি। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রথম খাবার গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ১৯ শতাংশ এবং দুপুরের পর প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ২৯ শতাংশ বেশি ছিল।

দুপুরের পর প্রথমবার খাবার গ্রহণকারীদের হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে ৪৬ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়।

রাতের খাবারেও সময়ের প্রভাব

দিনের শেষ খাবারের ক্ষেত্রে সরলভাবে ‘যত দেরি, তত ঝুঁকি’—এমন ফল পাওয়া যায়নি। গবেষণায় সবচেয়ে কম ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত সময় ছিল আনুমানিক রাত ৮টার কাছাকাছি।

সন্ধ্যা ৭টার আগেই শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি ছিল। আর মধ্যরাতের পর শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি ছিল ২৭ শতাংশ বেশি।

গবেষকদের মতে, গভীর রাতে খাবার খেলে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ির স্বাভাবিক ছন্দ এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

শুধু না খেয়ে থাকার সময় নয়

গবেষণায় ‘ইটিং উইন্ডো’ বা দিনের প্রথম ও শেষ খাবারের মধ্যকার সময়ও বিবেচনা করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, কত ঘণ্টা ধরে খাবার খাওয়া হচ্ছে—শুধু এই সময়ের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির ধারাবাহিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং দিনের কোন সময়ে খাওয়া শুরু হচ্ছে, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় এর ফলকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। দেরিতে খাওয়ার সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, শিফটভিত্তিক কাজ, বয়স, অসুস্থতা বা আর্থসামাজিক অবস্থার মতো অন্য কারণও জড়িত থাকতে পারে।

এ ছাড়া গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের খাবারের তথ্য মূলত নির্দিষ্ট সময়ের ২৪ ঘণ্টার খাদ্যতালিকার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল। তাই দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।

গবেষকদের সতর্কতা হলো—শুধু এই গবেষণার ফল দেখে খাবারের সময়সূচিতে বড় ধরনের বা চরম পরিবর্তন আনা উচিত নয়। বরং ফলাফলটি মনে করিয়ে দেয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে কী খাচ্ছি তার পাশাপাশি কখন খাচ্ছি—সেটিও বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

কখন কী খাবেন—সহজ চার্ট

সময় কী খাওয়া যেতে পারে কেন উপকারী
সকাল ৭–৮টা ওটস/রুটি, ডিম, দুধ বা দই, ফল দিনের শুরুতে শক্তি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে
সকাল ১০–১১টা একটি ফল, বাদাম বা দই ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত খাওয়া কমাতে
দুপুর ১–২টা ভাত/রুটি, মাছ বা মাংস, ডাল, প্রচুর সবজি দিনের প্রধান পুষ্টি ও শক্তির চাহিদা মেটাতে
বিকেল ৪–৫টা ফল, বাদাম, দই বা হালকা নাশতা রাতের খাবারের আগে অতিরিক্ত ক্ষুধা কমাতে
সন্ধ্যা ৭–৮টা পরিমিত ভাত/রুটি, মাছ/মুরগি, সবজি ও সালাদ রাতে হজমের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখতে
রাত ৯টার পর সম্ভব হলে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন গভীর রাতে খাবার শরীরের জৈবঘড়ি ও বিপাকীয় ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে
মধ্যরাতের পর নিয়মিত খাবার না খাওয়াই ভালো গবেষণায় এ সময়ে শেষ খাবারের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে

মূলকথা: নিয়মিত সময়ে, দিনের তুলনামূলক শুরুর দিকে খাবার গ্রহণ এবং গভীর রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে। তবে সবার বয়স, কাজের সময়সূচি, ঘুম, শারীরিক অবস্থা ও রোগভেদে খাদ্যাভ্যাস আলাদা হওয়া স্বাভাবিক। গবেষণাটিও খাবারের সময়কে সরাসরি মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রমাণ করেনি।