ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৪ ।। সরকারের গেল মাস ছয় : আগামীর জন্য লাগছে ভয়

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৪ ।। সরকারের গেল মাস ছয় : আগামীর জন্য লাগছে ভয়

উৎসর্গ:
যারা প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালান,
যাদের ঘামেই দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে—
এই লেখা তাঁদের জন্য।

য় মাস খুব বেশি সময় নয়। একটি সরকারের জন্য তো আরও নয়। কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে ছয় মাস অনেক কিছু জানান দেয়। কোথায় সরকার সফল হচ্ছে, কোথায় হোঁচট খাচ্ছে, আর সামনে কোন পথে হাঁটতে হবে—তার একটা প্রাথমিক ছবি এই সময়েই পাওয়া যায়।

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক হিসাবও তেমন একটি ছবি সামনে এনেছে। ছবিটি একেবারে কালো নয়, আবার স্বস্তিরও নয়। বরং কিছু জায়গায় আলো দেখা গেলেও বড় অংশজুড়ে অস্বস্তির ছায়া।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ—সিপিডির মূল্যায়নে অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১২টিতে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ১৯টিতে অবনতি। চাঁদাবাজি, ঘূষ, খুন এসব এখন না হয় আলোচনা নাই-বা করা হলো। কিন্তু এই একটি পরিসংখ্যানই বলে দেয়, সামনে কেন ভয় লাগছে।

তবে ভয় পাওয়ার আগে পুরো ছবিটা দেখা দরকার।

ভালো খবরও আছে

অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৪.৮২৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১.৩ শতাংশ বেশি।

রিজার্ভও বেড়েছে। ১৮ আগস্ট মোট রিজার্ভ ছিল ৩৭.২৪ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩২.৪৩ বিলিয়ন ডলার।

এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো খবর।

মূল্যস্ফীতিতেও সামান্য স্বস্তি এসেছে। সিপিডির হিসাবে, ফেব্রুয়ারির ৯.১ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮.৩ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমেছে।

কিন্তু এখানেই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—মূল্যস্ফীতি কমেছে মানেই পণ্যের দাম কমেছে, এমন নয়। দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র। বাজারে যে দাম একবার উঠে গেছে, তা সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লে এখনো তার ঘাড়েই চেপে বসে থাকে।

ভালো খবরের আড়ালে যে ভয়

এবার আসি অস্বস্তির জায়গায়।

সিপিডির হিসাবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।

সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, রাজস্ব আদায়ের গতি সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি নেই।

এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২.৪ শতাংশ থেকে ১১.১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি আরও ভয়াবহভাবে কমে ১২.৩ শতাংশ থেকে মাত্র ৪.৯ শতাংশ হয়েছে।

সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতাও ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩.৮ শতাংশ হয়েছে।

এখানে প্রশ্নটা খুব সহজ—সরকার যদি নিজের আয় বাড়াতে না পারে, তাহলে আগামী দিনে ব্যয় চালাবে কীভাবে?

ঋণ দিয়ে কিছুদিন চালানো যায়। কিন্তু ঋণ কোনো আয় নয়। ঋণ হলো ভবিষ্যতের আয় থেকে আজকের খরচ মেটানো।

সবচেয়ে বড় ভয় চাকরিতে

অর্থনীতির আসল পরীক্ষা শেয়ারবাজার, রিজার্ভ কিংবা বাজেটের অঙ্কে নয়। আসল পরীক্ষা মানুষের হাতে কাজ আছে কি না।

এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ।

জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।

ভাবুন, ৬১ হাজার ৮৮১টি পরিবারে এর প্রভাব কতটা।

একজন শ্রমিক চাকরি হারালে শুধু তার মাসিক বেতন বন্ধ হয় না। সন্তানের স্কুল, বাসাভাড়া, খাবার, চিকিৎসা—সবকিছুতে টান পড়ে। একজন শ্রমিকের পেছনে যদি চারজন মানুষের পরিবার থাকে, তাহলে এই একটি সংখ্যার সামাজিক অভিঘাত কয়েক লাখ মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়।

শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে আসা তাই শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যতের চাকরির বাজারের জন্যও সতর্ক সংকেত।

গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকলে বিনিয়োগ আসবে কীভাবে?

বাংলাদেশের শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা জ্বালানি।

গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকছে। ফলে অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবেন কেন?

একজন উদ্যোক্তা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কারখানা বানাবেন। তারপর যদি উৎপাদনের সময় গ্যাস না থাকে, বিদ্যুৎ না থাকে, পণ্য বন্দরে আটকে থাকে, ব্যাংক ঋণ না দেয়—তাহলে তিনি নতুন বিনিয়োগে যাবেন কেন?

অর্থনীতি শুধু ভালো নীতি দিয়ে চলে না। ব্যবসার পরিবেশও ভালো করতে হয়।

ব্যাংকিং খাতের পুরোনো রোগ

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা ব্যাংকিং খাত।

খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, দুর্বল সুশাসন—এসব সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। আবার একদিনে সমাধানও হবে না।

কিন্তু সমাধানের কাজ যদি এখনই শক্ত হাতে শুরু না হয়, তাহলে এর মূল্য দিতে হবে ভবিষ্যতে।

ব্যাংক যদি ভালো উদ্যোক্তাকে ঋণ না দেয়, নতুন শিল্প হবে না। নতুন শিল্প না হলে কর্মসংস্থান হবে না। কর্মসংস্থান না হলে মানুষের আয় বাড়বে না। আয় না বাড়লে বাজারও শক্তিশালী হবে না।

অর্থনীতির চাকা এভাবেই এক জায়গায় আটকে যায়।

তাহলে সরকারের অর্জন কোথায়?

অবশ্যই আছে।

রেমিট্যান্স বেড়েছে। রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এসেছে।

এ ছাড়া এমপিদের গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার, এআই ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর মতো কিছু পদক্ষেপকে সিপিডি ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে।

অর্থাৎ সরকার একেবারে কিছুই করেনি—এমন বলা তথ্যসম্মত হবে না।

কিন্তু সমস্যা হলো, ভালো উদ্যোগগুলো এখনো অর্থনীতির বড় সংকটগুলোকে পাল্টে দেওয়ার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি।

সুশাসনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ

অর্থনীতি আর সুশাসনকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট—এসব ব্যবসার খরচ বাড়ায়। প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগকারীর সময় ও অর্থ নষ্ট করে।

সিপিডি মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মব সহিংসতা, নারী-শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাতেও উদ্বেগ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

একটি দেশে বিনিয়োগ করতে হলে বিনিয়োগকারী শুধু করের হার দেখেন না। তিনি দেখেন—আইনের শাসন আছে কি না, প্রশাসন নিরপেক্ষ কি না, নিজের বিনিয়োগ নিরাপদ কি না।

সুতরাং সুশাসন আসলে অর্থনৈতিক নীতিরই অংশ।

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব?

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি।

ফলে সরকার কোন অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এবং ছয় মাসে কতটা এগিয়েছে—তা পরিমাপ করা কঠিন।

এটি শুধু গবেষকদের সমস্যা নয়। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ রোগীর চিকিৎসা শুরু করার আগে তার রোগের সঠিক অবস্থা জানা দরকার। অর্থনীতিও তার ব্যতিক্রম নয়।

আগামী ছয় মাসই আসল পরীক্ষা

ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু ছয় মাস পর অন্তত বোঝা উচিত, সরকার কোন দিকে যাচ্ছে।

এখন সরকারের সামনে কয়েকটি কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি আরও কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায়ের কাঠামো সংস্কার করে সরকারের নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে খেলাপি ঋণ আদায় ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে শিল্প উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে হবে।

পঞ্চমত, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

ষষ্ঠত, বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরাতে প্রশাসনিক হয়রানি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কমাতে হবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সংস্কার করতে হবে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে।

ভয়টা এখানেই

ছয় মাসের অর্থনৈতিক হিসাব থেকে আমি আতঙ্কের কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে চাই না। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তিও কম নয়।

আমাদের বড় শ্রমশক্তি আছে, বিশাল ভোক্তা বাজার আছে, রপ্তানি সক্ষমতা আছে, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আছে। সবচেয়ে বড় কথা—এই অর্থনীতি বহু সংকট পেরিয়ে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

কিন্তু শক্ত অর্থনীতিও ভুল নীতির কাছে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

আজ রেমিট্যান্স বাড়ছে—ভালো কথা। রিজার্ভ বাড়ছে—আরও ভালো কথা। কিন্তু একই সময়ে যদি কারখানা বন্ধ হয়, চাকরি চলে যায়, বিনিয়োগ থেমে যায়, রাজস্ব কমে এবং সরকার ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য প্রশ্ন থেকেই যায়।

সরকারের গেল ছয় মাস আমাদের দেখিয়েছে—অর্থনীতির কিছু বাতি জ্বলেছে, কিন্তু অনেকগুলো সতর্ক সংকেতও জ্বলছে।

আগামী ছয় মাসে সরকার যদি এই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে আজকের আশঙ্কা আগামী দিনের আশায় পরিণত হতে পারে।

আর যদি সমস্যাগুলোকে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, তাহলে ছয় মাসের এই সতর্কবার্তাই একসময় বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।

অর্থনীতির সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রিজার্ভ কত আছে, সেটি নয়; মানুষের হাতে কাজ কতটা ফিরছে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,   ২৫ আগস্ট, ২০২৬