‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৫।। হারানো মানিক

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৫।। হারানো মানিক

।। হারানো মানিক।।

উৎসর্গ

**পৃথিবীর সেইসব মায়ের প্রতি,
যারা হারিয়ে যাওয়া সন্তানের অপেক্ষায়
দরজার দিকে তাকিয়ে জীবন কাটিয়ে দেন।

বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়ান।

উঠানে মানুষের ভিড়।

মাঝখানে একটি হুইলচেয়ার।

হুইলচেয়ারে বসে থাকা মানুষটি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। নুরজাহান তাঁকে চিনতে পারেন না।

লোকটি ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে চায়।

তারপর কাঁপা গলায় উচ্চারণ করে—

‘মা...’

নুরজাহানের শরীরটা যেন জমে যায়।

পঁচিশ বছর ধরে তিনি এই একটি শব্দের অপেক্ষায় আছেন কি না, নিজেও জানেন না।

তিনি আরেকটু এগিয়ে যান।

চোখ কুঁচকে লোকটির মুখের দিকে তাকান।

এ কি তাঁর সেই ফরিদ?

না, অসম্ভব।

তাঁর ফরিদ তো দশ বছরের একটি ছেলে। বাবার হাত ধরে একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই ছেলে এখন এত বড় মানুষ হয় কী করে?

হঠাৎ পাশ থেকে ছোট ছেলে সৈয়দ আলম বলে ওঠে,

‘মা, হাতটা দেখেন।’

হুইলচেয়ারে বসে থাকা মানুষটি হাত তুলে ধরেন।

নুরজাহান কাঁপা হাতে তাঁর আঙুলগুলো গুনতে থাকেন।

এক... দুই... তিন... চার... পাঁচ...

তারপর আরও একটি।

ছয়টি আঙুল।

নুরজাহানের মুখ থেকে শব্দ বের হয় না।

তিনি শুধু একবার আকাশের দিকে তাকান।

তারপর ঝাঁপিয়ে পড়েন ছেলের ওপর।

‘ফরিদ...! আমার ফরিদ...!’

পঁচিশ বছর আগে এই বাড়ি থেকেই ফরিদ চলে গিয়েছিল।

তখন তার বয়স মাত্র দশ বছর।

দারিদ্র্যের সংসার। বাবা আয়ুব আলী সিদ্ধান্ত নেন, ছেলে ফরিদকে সঙ্গে নিয়ে দেশ ছাড়বেন। সীমান্ত পেরিয়ে ভারত হয়ে পাকিস্তানে যাবেন। সেখানে কোনো কাজ জুটলে সংসারের অবস্থার পরিবর্তন হবে—এই স্বপ্নই তাঁদের যাত্রার সঙ্গী।

বিদায়ের দিন নুরজাহান ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,

‘বাবার হাত ছাড়িস না।’

ফরিদ মাথা নেড়ে বলেছিল,

‘আমি আবার ফিরমু, মা।’

তারপর সে চলে যায়।

মা দাঁড়িয়ে থাকেন।

ছেলের ফিরে আসার কথা তখন তাঁর মনে ছিল না।

তিনি ভেবেছিলেন, কিছুদিন পরই আবার দেখবেন।

কিন্তু সেই কিছুদিন ধীরে ধীরে মাস হয়।

মাস থেকে বছর।

তারপর বছর পেরিয়ে যায় বছরের পর বছর।

পাকিস্তানে বাবা-ছেলের জীবন সহজ ছিল না।

জীবিকার সন্ধানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে হয়। এর মধ্যেই একদিন ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

ফরিদ ট্রেনে কাটা পড়ে।

দুই পা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে চিকিৎসকদের তা কেটে ফেলতে হয়।

খবরটি যখন নুরজাহানের কাছে পৌঁছায়, তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না।

তাঁর ছেলে বেঁচে আছে—এটাই ছিল একমাত্র সান্ত্বনা।

কিন্তু কিছুদিন পর সেই সান্ত্বনাটুকুও হারিয়ে যায়।

ফরিদের আর কোনো খবর আসে না।

একসময় মানব পাচারকারীদের একটি চক্র তাঁর কাছে আসে। তারা ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখায়। চাকরি দেবে, উন্নত দেশে নিয়ে যাবে—এমন নানা প্রলোভন।

একপর্যায়ে ফরিদকে নিয়ে যাওয়া হয় তুরস্কে।

তারপর পাকিস্তানে রয়ে যান বাবা আয়ুব আলী।

আর ছেলে চলে যায় অন্য দেশে।

সেখান থেকেই বাবা-ছেলের জীবনও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

তুরস্কের সমুদ্রতীরে বসে ফরিদ পানি বিক্রি করেন।

দুই পা নেই।

হুইলচেয়ারে কিংবা অন্যের সহায়তায় তাঁকে চলাফেরা করতে হয়।

চারপাশে সমুদ্রের ঢেউ ওঠে।

মানুষ আসে।

মানুষ চলে যায়।

কিন্তু ফরিদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

বাংলাদেশে তাঁর মা আছেন।

ভাইরা আছেন।

একটি বাড়ি আছে।

কিন্তু সেই বাড়ির ঠিকানা যেন কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেছে।

তিনি অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বছরের পর বছর তুরস্কে বসবাস করেন।

এদিকে উখিয়ার বাড়িতে তাঁর মা ছেলের মৃত্যুর খবর না পেয়েও একসময় ধরে নেন—ফরিদ আর নেই।

মানুষজনও তাই বলে।

‘এত বছর কোনো খবর নাই। বেঁচে থাকলে কি আর যোগাযোগ করত না?’

নুরজাহান কোনো উত্তর দেন না।

কিন্তু সন্ধ্যা নামলে আজও তাঁর চোখ চলে যায় বাড়ির দরজার দিকে।

কখনো কখনো মনে হয়—

খোকা ফিরবে?

নাকি আর কোনোদিন ফিরবে না?

তারপর একদিন তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফরিদকে আটক করে।

অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

১৮ আগস্ট ভোরে তিনি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন।

কিন্তু বিমানবন্দরে নেমে দেখা যায়, তিনি নিজের পরিচয়ও ঠিকমতো বলতে পারছেন না।

এত বছর দেশ থেকে দূরে থাকার পর তাঁর স্মৃতি যেন ছিন্নভিন্ন।

তিনি শুধু নিজের নাম বলেন—

ফরিদ।

মা-বাবার নাম বলেন।

তারপর বলেন—

‘উখিয়া... কক্সবাজার...।’

এই সামান্য সূত্র ধরেই শুরু হয় পরিবারের সন্ধান।

বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে তাঁকে সহায়তা দেওয়া হয়। পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় উখিয়ার সেই পরিবারটির সন্ধান শুরু করেন।

মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় নুরজাহান বেগমদের বাড়ি।

তারপর ভিডিও কলে কথা হয় ছোট ভাই সৈয়দ আলমের সঙ্গে।

প্রথমে দুই ভাইয়ের কেউ কাউকে চিনতে পারে না।

পঁচিশ বছর অনেক বড় সময়।

তারপর ফরিদ হাত তুলে ধরেন।

ছয়টি আঙুল।

সৈয়দ আলমের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।

‘ভাইজান...?’

ওপাশে ফরিদের চোখ ভিজে যায়।

এখন তিনি বাড়ির উঠানে।

মা তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন।

ভাইরা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

কেউ চোখের পানি লুকাচ্ছে।

কেউ ফরিদের মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করতে পারছে না—পঁচিশ বছর ধরে যাঁকে মৃত ভেবে এসেছে, তিনি সত্যিই ফিরে এসেছেন।

হঠাৎ নুরজাহান ছেলের মুখ দুহাতে তুলে ধরেন।

‘তোর বাবা কই, ফরিদ?’

ফরিদ মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মায়ের চোখে আবার ভয় নেমে আসে।

‘তোর বাবা কি বেঁচে আছে?’

ফরিদ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।

‘বাবা পাকিস্তানে...’

নুরজাহান বেগমের ঠোঁট কেঁপে ওঠে।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন,

‘তুই কি তোর বাবারে দেখছিস?’

ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

তারপর ভাঙা স্মৃতির ভেতর থেকে যেন কথা খুঁজে বের করে।

বাবা পাকিস্তানে আছেন—এটুকু সে জানে।

তারপর পাকিস্তান থেকে তুরস্কে চলে যাওয়ার পর কত বছর কেটে গেছে, বাবার সঙ্গে তাঁর কীভাবে, কতটা যোগাযোগ ছিল—সেই হিসাব যেন আর ঠিকমতো সাজাতে পারে না।

ভাইয়েরাও প্রশ্ন করে।

‘আব্বার খবর কী? তিনি কেমন আছেন? আমাদের কথা কি কখনো বলতেন?’

ফরিদ একবার মায়ের দিকে, একবার ভাইদের দিকে তাকায়।

পঁচিশ বছর পর ফিরে আসা মানুষের কাছে অনেক প্রশ্ন।

কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর নেই।

তারপরও একটি প্রশ্ন সবার চোখে রয়ে যায়—

ফরিদ ফিরে এসেছে। আয়ুব আলী কি কোনোদিন ফিরবেন?

নুরজাহান আবার ছেলের মাথায় হাত রাখেন।

হঠাৎ তাঁর চোখ চলে যায় হুইলচেয়ারের দিকে।

‘তোর পা দুইডা কেমনে গেল, বাবা?’

ফরিদ চুপ করে থাকেন।

মায়ের হাত তাঁর হাতের ওপর।

একটি হাতে ছয়টি আঙুল।

এই বাড়তি আঙুলই পঁচিশ বছর পর ফিরিয়ে দিয়েছে তাঁর পরিচয়।

নুরজাহান চোখ মুছতে মুছতে বলেন,

‘পা নাই তো কী হইছে? আল্লাহ তো আমার পোলাডারে ফিরাইয়া দিছে।’

ফরিদ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারেন না।

মায়ের হাত ধরে মাথা নিচু করে কাঁদেন।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে আসে।

পঁচিশ বছর ধরে যে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন নুরজাহান বেগম, আজ সেই দরজা দিয়েই তাঁর হারিয়ে যাওয়া ছেলে ঘরে ফিরেছে।

দশ বছরের শিশু হয়ে নয়।

পঁয়ত্রিশ বছরের একজন মানুষ হয়ে।

দুই পায়ে হেঁটে নয়।

হুইলচেয়ারে বসে।

তবু সে ফিরেছে।

পৃথিবীর নানা দেশ, সীমান্ত, দুর্ঘটনা, দালাল, সমুদ্র আর পঁচিশ বছরের অন্ধকার পেরিয়ে—

মায়ের কাছে।

মা শুধু বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলেন—

‘এই যে আমার হারানো মানিক। আমার খোকা। পঁচিশ বছর পরে আমার কাছে ফিরছে। এবার আর যাইস না, বাবা।’

ফরিদ কিছু বলেন না।

শুধু মায়ের হাতটি আরও শক্ত করে ধরে রাখেন।

মনে হয়, পঁচিশ বছর পর তিনি অবশেষে এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছেন, যেখানে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই।

লন্ডন, ২৫ আগস্ট, ২০২৬