বাংলাদেশ সংবাদ
দেশে ৮ মাসে ২২৪ কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার, আত্মহত্যা ১৩৩ জন
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৭ আগস্ট:
মাত্র আট মাসে দেশে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২২৪ কন্যাশিশু। একই সময়ে হত্যা করা হয়েছে ৮১ জনকে, আর আত্মহত্যা করেছে ১৩৩ জন। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার এই চিত্র তুলে ধরে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কন্যাশিশুদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সংগঠনটি এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার ২২৪ কন্যাশিশুর মধ্যে ১৩৪ জন এককভাবে এবং ৩৩ জন গণ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনেরচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৩২ জন। নয়জন প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে অন্তত ৩৫টি ঘটনায়।
সংগঠনটির ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান বলেন, নির্যাতনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার পরও এ অপরাধ কমেনি। তার মতে, কেবল শাস্তির বিধান থাকলেই হবে না; অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আট মাসে ৮১ কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, পুরোনো শত্রুতা, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের মতো কারণ এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ২০ কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যুরও তথ্য পাওয়া গেছে।
আত্মহত্যার সংখ্যাটিও উদ্বেগজনক। ১৩৩ কন্যাশিশুর আত্মহত্যার পেছনে হতাশা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা কাজ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতনের শিকার শিশুদের কথা বলার বা নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
একই সময়ে ২৮ কন্যাশিশু যৌন হয়রানি ও অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ১৯ জন। পানিতে ডুবে মারা গেছে ১৮৭ কন্যাশিশু। গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১০ জন কন্যাশিশু; তাদের মধ্যে একজনকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কন্যাশিশুর প্রতি অবহেলা ও বঞ্চনা কেবল একটি পরিবারের সমস্যা নয়, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো সমাজকে বহন করতে হয়। তিনি কন্যাশিশুর পুষ্টি, বাল্যবিবাহ এবং অল্প বয়সে মাতৃত্বের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সংগঠনটি শিশু নির্যাতন ও নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে পৃথক আইন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি এবং শিশু সুরক্ষায় পৃথক অধিদপ্তর গঠনের দাবি জানিয়েছে।
তাদের মতে, কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও সরকারের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সমাজকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা শুধু একটি ঘটনা নয়—এর পেছনে রয়েছে একটি শিশুর ভেঙে যাওয়া নিরাপত্তাবোধ এবং একটি পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী বেদনা।