বিশ্ব সংবাদ
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে মহাবিপর্যয়: ১৬০ নিহত, ৮ শতাধিক নিখোঁজ; ৩৩ ব্রিটিশের সন্ধানে অভিযান
বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ২৭ আগস্ট:
হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা ও কাদার ঢলে অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছেন। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু নেপালেই ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিব্বতের চীনা অংশে আরও অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক, যাঁদের মধ্যে মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীও রয়েছে। নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৪০০-র বেশি পর্যটক ও ভ্রমণকারীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। বিভিন্ন সময়ের সরকারি হিসাব মিলিয়ে মোট নিখোঁজের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভোতে কোশি নদী এলাকায় এই বিপর্যয় শুরু হয়। পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীতে নেমে এসে ভয়াবহ ঢলের সৃষ্টি করে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পানির বিশাল দেয়াল সীমান্ত এলাকার বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করছেন। চিতওয়ান, গোরখা, ধাদিং, নুয়াকোট, তানাহুন, নাওয়ালপারাসি ইস্ট ও রাসুওয়াসহ একাধিক জেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সন্ধ্যা নামার পরও উদ্ধারকর্মীরা মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

নিখোঁজ ব্রিটিশদের মধ্যে ১৩ বছরের কিশোরী
নিখোঁজ ৩৩ ব্রিটিশ নাগরিকের বয়স ১৩ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। তাঁদের একটি অংশ পবিত্র কৈলাশ পর্বত সফরে গিয়েছিলেন। পর্যটন সংস্থা Alpine Eco Trek জানিয়েছে, তাদের একটি দলের সদস্যরা নেপাল থেকে তিব্বতে প্রবেশের সময় আকস্মিক বন্যার মধ্যে আটকা পড়েন।
দলের গাইডদের সঙ্গে সকাল ৮টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। এরপর তাঁদের ফোন বন্ধ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, তখন দলটি তিব্বতের সীমান্ত অভিবাসন কার্যালয়ের কাছাকাছি ছিল। পরে পাওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, সেই সীমান্ত এলাকাও ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। সংস্থাটির চার নেপালি গাইড এবং দুই আইরিশ নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
ভেসে গেছে সেতু, সড়ক ও জনপদ
প্রবল স্রোতে নেপাল-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ ভেসে গেছে। সীমান্তের অভিবাসন কার্যালয়সহ আশপাশের বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। নেপালের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোথাও কোথাও পুরো গ্রাম ও বাজার এলাকা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে এবং দুর্গম এলাকায় মানুষ আটকা পড়েছেন।
ভূমিকম্প, ভূমিধস নাকি হিমবাহ ধস—তদন্ত চলছে
বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। নেপালের কর্মকর্তারা শুরুতে ধারণা করেছিলেন, কোনো ভূমিকম্পের পর তুষার ও পাথরের ধস নেমে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়, যে ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি সম্ভবত ভূমিকম্পের কারণে নয়; বরং বড় ধরনের ভূমিধসের ফল। অন্যদিকে পাহাড় ও হিমবাহ বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, উঁচু হিমালয়ে হিমবাহের কোনো অংশ ধসে বিশাল কাদা-পাথরের স্রোত সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আরও আশঙ্কা, উজানে ধসের কারণে নদীর প্রবাহ আংশিক বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকলে নতুন করে আরেকটি আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
‘চোখের সামনে সব ভেসে গেল’
বেঁচে যাওয়া মানুষের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহতার চিত্র। এক ব্যক্তি জানান, কাদা ও পানির বিশাল ঢল তাঁদের বাড়ির দিকে ধেয়ে আসতে দেখে তিনি স্ত্রীকে ধরে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্রোত তাঁর স্ত্রীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
আরেক ব্যক্তি একটি আমগাছ আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর চোখের সামনে তিনি যে বাড়িতে কাজ করছিলেন, সেটি স্রোতে মিলিয়ে যেতে দেখেন।
এক নারী জানিয়েছেন, তাঁর বাবা-মা, বোন এবং বোনের সন্তানদের চোখের সামনে বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি ও তাঁর ছেলে একটি বাড়ির ছাদে উঠে কোনোভাবে প্রাণে বেঁচেছেন।
উদ্ধারে সেনাবাহিনী, আন্তর্জাতিক সহায়তা
নেপাল সেনাবাহিনী ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম এলাকায় আবহাওয়া ও ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে। ৪০-এর বেশি আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।
চীন, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নেপালকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্ধার অভিযান জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন। ভারত ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করতে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, নেপাল-চীন সীমান্তে আকস্মিক বন্যার ঘটনায় তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ব্রিটিশ কনস্যুলার কর্মকর্তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিটিশ নাগরিকদের সহায়তায় কাজ করছেন।
হিমালয়ের পাদদেশে এখন চলছে এক নির্মম উদ্ধার অভিযান। কাদার নিচে চাপা পড়া ঘরবাড়ি, ভেঙে যাওয়া সেতু আর যোগাযোগবিচ্ছিন্ন পাহাড়ি জনপদের মধ্যে উদ্ধারকারীরা খুঁজে ফিরছেন জীবনের চিহ্ন। আর নেপাল, তিব্বত, যুক্তরাজ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শত শত পরিবার অপেক্ষা করছে—নিখোঁজ স্বজনের একটি খবরের জন্য।