২৭ দিনে ১১ বার ভূমিকম্প: তবে কি মহা প্রলয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ ?
স্টাফ রিপোর্টার, ২৮ ফেব্রুয়ারি:
টানা কয়েকদিনের ভূমিকম্পে কাঁপছে বাংলাদেশ, কোলকাতা ও আশপাশের দেশগুলো। সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে ৫.৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর আতঙ্ক আরও বেড়েছে জনমনে। এর আগে বুধবার ৫.১ এবং বৃহস্পতিবার ৩.৭ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ১০ দফা ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। গত ২৭ দিনে ১১ বার ভূমিকম্পে কাঁপলো গোটা দেশ। ঘন ঘন এই কম্পনে সাধারণ মানুষের মধ্যে অজানা আশঙ্কা—তবে কি বড় কোনো মহাদুর্যোগের পূর্বাভাস?
ইউরোপীয় ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা European-Mediterranean Seismological Centre (ইএসএমসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের United States Geological Survey (ইউএসজিএস) জানায়, শুক্রবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৩ এবং এর উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা অঞ্চলে, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার গভীরে। দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে অনুভূত এ কম্পন কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কম্পন টের পাওয়া যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানায়, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো অধিকাংশই মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ও মাঝারি মাত্রার ঘনঘন ভূমিকম্প ভূত্বকের ভেতরে সঞ্চিত শক্তির ইঙ্গিত বহন করতে পারে। দীর্ঘ সময় বড় মাত্রার শক্তি মুক্ত না হলে তা বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভূতত্ত্ববিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে ঐতিহাসিকভাবেই এ অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। গত বছরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণহানির ঘটনা এখনও মানুষের মনে তাজা। আহত হয়েছিলেন শতাধিক মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অসংখ্য স্থাপনা। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে সিলেট বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগ।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ৭ মাত্রার নিচের ভূমিকম্প সাধারণত মাঝারি ধরা হলেও ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত নগরায়নের দেশে মাঝারি ভূমিকম্পও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে রাজধানীর বহু ভবন এখনো পুরোপুরি ভূমিকম্প সহনীয় নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন আরও ব্যাপক, মানে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আসতে পারে। ঢাকাসহ সারা দেশের মাটি নিচ অথ্যন্ত নরম। ৫-২৫ মাইলের নিচে একদম কাঁদামাটি। অপরিকল্পিতভাবে গত কয়েক দশক ধরে যেভাবে নগরায়ন হচ্ছে তাতে ঐ মাত্রার ভূমিকম্প হলে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় লিকুজেশন হতে পারে। অর্থাৎ পুরো বিল্ডিংসহ মাটির নিচে দেবে যেতে পারে। ঢাকাসহ অনেক জেলা হয়তো মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে চিরতরে।
তবুও বৈজ্ঞানিকরা বলছেন, আতঙ্ক নয়—প্রস্তুতিই হতে পারে সমাধান। প্রয়োজন আধুনিক সিসমোগ্রাফ স্থাপন, নিয়মিত গবেষণা, বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
টানা কম্পনে প্রশ্ন উঠছে—এ কি কেবল বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা, নাকি বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস? তাহলে এসব ভূমিকম্প কি একটা মহাপ্রলয়ের আভাস দিচ্ছে? নিশ্চিত উত্তর না মিললেও বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিচ্ছেন, অবহেলার সময় আর নেই। দেশটা যেন মহা প্রলয়ের অপেক্ষায় না থেকে প্রস্তুতির পথে হাঁটে—এটাই এখন সময়ের দাবি।