‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
তাকাইচি-তারেক বৈঠক: বাংলাদেশকে ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি জাপানের
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৮ অক্টোবর:
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৬ অক্টোবর শুরু হওয়া এই সফরে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তারেক-তাকাইচি অফিসিয়াল বৈঠক
২৭ অক্টোবর তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি সহযোগিতামূলক দলিল স্বাক্ষরিত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মোট ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয় জাপান। এ ছাড়া দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা ৬.৩ বিলিয়ন ডলার
সফরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা। জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে জাপানি কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে গাড়ি ও অন্যান্য শিল্পপণ্য উৎপাদন, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন। তবে এই অর্থ এখনই বাংলাদেশকে দেওয়া হচ্ছে না। জাপানি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী পাঁচ বছরে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে পারে—এটি সেই পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার হিসাব।
দুটি প্রকল্পে ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার দুটি প্রকল্পে জাপান ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রথম প্রকল্পে ১৫.৮৮ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১০০.৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।
দ্বিতীয় প্রকল্পটি উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়। এ জন্য ৩০.৬৮ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১৯৪.৭ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো।
দুটি প্রকল্পের ঋণ মিলিয়ে মোট ৪৬.৫৬ বিলিয়ন ইয়েন, যা প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি ঋণের প্রতিশ্রুতি; অর্থ ছাড় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট শর্ত ও প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
তারেক রহমান মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতির সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সহিংসতা বন্ধ, বাধাহীন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বাংলাদেশে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে জাপান সরকারের সহযোগিতার প্রশংসা করে তিনি সংকট সমাধানে টোকিওকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
৬ টি সহযোগিতামূলক দলিলে যা রয়েছে
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ছয়টি দলিলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, কৃষি, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাড়াতে টহলজাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২.১২ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১৩.৪৪ মিলিয়ন ডলারের অনুদান চুক্তিও হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সমুদ্রে অপরাধ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন।
জ্বালানি নিরাপত্তায় আরও ৩২০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা নিয়ে আলোচনা
তারেক রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলারের জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে এই অর্থকে ইতিমধ্যে অনুমোদিত বা ছাড় করা ঋণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার অংশ; সহায়তার শর্ত ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।
প্রযুক্তি পার্ক ও দ্রুতগতির রেল নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশে একটি বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন তারেক রহমান। এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তিতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশল, ছয়টি বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগের বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়ন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য এখনো প্রয়োজন।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতা
বৈঠকে দুই দেশের নেতারা ‘বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয়’ বা বিআইজি-বি উদ্যোগকে ‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামোয় উন্নীত করতে সম্মত হয়েছেন।
এর লক্ষ্য যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি, শিল্প অবকাঠামো, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক জোরদার করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দুই দেশের নেতারা বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও একমত হয়েছেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই সফরের সম্ভাব্য সুফল নির্ভর করবে বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, ঋণের যথাযথ ব্যবহার, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর। ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও আলোচিত সহায়তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।