তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

টাওয়ার হ্যামলেটসে নভেম্বরে শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী বাংলা নাট্যোৎসব

টাওয়ার হ্যামলেটসে নভেম্বরে শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী বাংলা নাট্যোৎসব

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৮ অক্টোবর:

পূর্ব লন্ডনের মঞ্চে এবার উঠে আসছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অজানা অভিজ্ঞতা, অভিবাসী পরিবারের চাপা পড়ে থাকা স্মৃতি, বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা, দুই প্রজন্মের দূরত্ব এবং সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা। এসব বৈচিত্র্যময় বিষয় নিয়ে আগামী নভেম্বর মাসে টাওয়ার হ্যামলেটসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘এ সিজন অব বাংলা ড্রামা ২০২৬’। মাসব্যাপী এ আয়োজনে থাকছে ১২টি নাট্যপ্রযোজনা এবং ৩০টিরও বেশি পার্শ্ব-অনুষ্ঠান।

‘স্টে কিউরিয়াস’ বা কৌতূহলী থাকার আহ্বানকে সামনে রেখে এবারের আয়োজন সাজানো হয়েছে। ১ থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে উৎসব। উদ্বোধনী বিশেষ আয়োজন ‘ন্যারেটিভস অব টাইম’ শুরু হবে ৩১ অক্টোবর। নাটকগুলোর পাশাপাশি কর্মশালা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কবিতা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে পারবেন দর্শকেরা।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও পারিবারিক গোপন কথা

‘আই হিয়ার হামিং’ নাটকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ও অভিজ্ঞতার আড়ালে থাকা ইতিহাস তুলে ধরা হবে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা সাদিয়া এবং বাংলাদেশে থাকা রাফি নিজেদের পরিবারের অতীত অনুসন্ধান করতে গিয়ে দাদা-দাদির প্রজন্মের চাপা পড়ে থাকা যুদ্ধের স্মৃতির সন্ধান পায়। দুই সময় ও দুই প্রজন্মের গল্পের মধ্য দিয়ে নাটকটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বাংলাদেশি পরিচয়ের প্রশ্ন সামনে আনবে।

‘উই ডোন্ট সে হার নেম’ নাটকে অভিনয়ের স্বপ্ন দেখা এক নাতনির অনুসন্ধান পরিবারের লুকানো একটি গোপন বিষয় সামনে নিয়ে আসে। সরাসরি বাংলা সংগীত ও বিভিন্ন প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নির্মিত দ্বিভাষিক এই প্রযোজনায় পারিবারিক ভয়, স্মৃতি, সাহস ও পরিবর্তনের গল্প বলা হবে।

মা-মেয়ের দূরত্ব ও অভিবাসী জীবনের টানাপোড়েন

‘টু আম্মি, উইথ লাভ’ একজন অভিবাসী মা ও তাঁর মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে একক নাটক। একই পরিবারের সদস্য হয়েও দুজনের মধ্যে যে আবেগগত দূরত্ব তৈরি হতে পারে, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মায়ের জীবনের অভিজ্ঞতা, না-বলা কথা, শোক ও স্মৃতি মেয়ের কাছে কীভাবে অজানা থেকে যায়, সেই বাস্তবতা উঠে আসবে মঞ্চে।

‘টুকরো টুকরো আকাশ’ নাটকে অভিবাসীদের নতুন জীবনের সন্ধান এবং নিজের ঘরে ফিরেও অপরিচিত বোধ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হবে। নতুন দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক—এই দুইয়ের টানাপোড়েন নাটকটির মূল বিষয়।

‘রিমেম্বার, দিস ইজ নট আওয়ার কান্ট্রি’ পূর্ব লন্ডনে বেড়ে ওঠা এক বাঙালি মেয়ের কৈশোর থেকে পরিণত হয়ে ওঠার গল্প। সমাজে নিজের অবস্থান, পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি এখানে গুরুত্ব পাবে।

বার্ধক্য, পরিচয় ও সমাজের প্রশ্ন

‘ওল্ড গেট’ নাটকে প্রবীণ মানুষের একাকিত্ব, যত্নের প্রয়োজন এবং সমাজের সঙ্গে সংযোগের বিষয়গুলো উঠে আসবে। বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের জীবন এক জায়গায় মিলিত হওয়ার মধ্য দিয়ে নাটকটি বার্ধক্য ও মানুষের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করবে।

‘মেরি মুবারক’ নাটকে ঈদ ও বড়দিন উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে ভিন্ন মতাদর্শের দুই ভাইবোন সানি ও সৈয়দের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হবে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পর্কের সম্ভাবনা নাটকটির অন্যতম আকর্ষণ।

‘কিউরিওসিটি: টুওয়ার্ডস দ্য আননোন’ বাংলা ধারার শ্রুতিনাট্য বা আবৃত্তিনির্ভর নাট্যপাঠ। পরিচয়, অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা ও নতুন কিছু আবিষ্কারের ভাবনাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে এই পরিবেশনা। অনুষ্ঠান শেষে অতিথির সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের সুযোগও থাকবে।

সংবাদমাধ্যমের ব্যঙ্গ, শিশুদের স্বপ্ন ও পুরাণের নতুন পাঠ

‘বায়োস্কোপ’ নাটকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিচালিত একটি কাল্পনিক কমিউনিটি টেলিভিশন স্টেশনের অস্থির পরিবেশকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হবে। গুজব, জনপ্রিয়তা, সাংস্কৃতিক বিতর্ক ও প্রতিযোগিতার মধ্যে এক তরুণ শিক্ষানবিশ এমন কিছু প্রশ্ন তোলে, যা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব এবং কমিউনিটির প্রকৃত প্রয়োজন নিয়ে দর্শকদের ভাবাবে।

‘দ্য লিটল উইংস অব প্যারাডাইস’ শিশুদের স্বপ্ন, সুন্দর পৃথিবীতে বেড়ে ওঠা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নির্মিত। যুদ্ধ ও সহিংসতার পরিবর্তে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও মানবিক ভবিষ্যৎ তৈরির বার্তা থাকবে এ প্রযোজনায়।

‘কিউরিওসিটি, লাভ অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন: অম্বা অ্যান্ড ভীষ্ম’ মহাভারতের পরিচিত চরিত্র অম্বা ও ভীষ্মের কাহিনিকে সমকালীন ব্রিটেনের প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করবে। পরিচয়, ভালোবাসা, সামাজিক প্রান্তিকতা, ব্যক্তিগত পরিবর্তন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এতে গুরুত্ব পাবে। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় নির্মিত এই নাটক পুরাণের কাহিনির সঙ্গে আধুনিক সমাজের অভিজ্ঞতার যোগসূত্র তৈরি করবে।

ছয় দশকের বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাস

উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ‘ন্যারেটিভস অব টাইম’। ন্যাশনাল লটারি হেরিটেজ ফান্ডের অর্থায়নে নির্মিত এই নাট্যসংকলনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নাট্যচর্চা এবং পূর্ব লন্ডনের কমিউনিটি জীবনের ছয় দশকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হবে। ব্রিটেনে বাংলা নাটকের বিকাশে শিল্পী ও কমিউনিটির অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

কবে, কোথায় দেখা যাবে

উৎসবের অধিকাংশ নাটক ও পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে ব্র্যাডি আর্টস অ্যান্ড কমিউনিটি সেন্টার এবং কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আর্টসওয়ান কেন্দ্রে।

প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ‘উই ডোন্ট সে হার নেম’ দেখা যাবে ৭ নভেম্বর, ‘ওল্ড গেট’ ৮ নভেম্বর, ‘মেরি মুবারক’ ১২ ও ১৩ নভেম্বর, ‘কিউরিওসিটি: টুওয়ার্ডস দ্য আননোন’ এবং ‘টুকরো টুকরো আকাশ’ ১৪ নভেম্বর, ‘রিমেম্বার, দিস ইজ নট আওয়ার কান্ট্রি’ ও ‘বায়োস্কোপ’ ১৫ নভেম্বর এবং ‘দ্য লিটল উইংস অব প্যারাডাইস’ ২১ নভেম্বর। ‘অম্বা অ্যান্ড ভীষ্ম’ মঞ্চস্থ হবে ২২ নভেম্বর এবং ‘টু আম্মি, উইথ লাভ’ ২৬ নভেম্বর।

‘আই হিয়ার হামিং’-এর পরিবেশনা রয়েছে ১৯ ও ২০ নভেম্বর। উদ্বোধনী নাট্যসংকলন ‘ন্যারেটিভস অব টাইম’-এর বিশেষ পরিবেশনা ৩১ অক্টোবর এবং ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।

নাটক ছাড়াও থাকছে লেখালেখি ও অভিনয়ের কর্মশালা, দ্বিভাষিক কবিতা, ঐতিহ্যবিষয়ক পদযাত্রা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র এবং পারিবারিক সৃজনশীল কার্যক্রম। অনেক অনুষ্ঠান বিনামূল্যে উপভোগ করা যাবে; কিছু অনুষ্ঠানে সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সংস্কৃতির পরিচিত গল্পের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিবর্তন ও পরিচয়ের জটিলতা নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করাই এই উৎসবের বিশেষত্ব।

পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি, টিকিট ও বুকিংয়ের তথ্য পাওয়া যাবে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে।