দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হবে: আইনমন্ত্রী
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ আগস্ট:
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে দেশে ফিরলেই তাঁকে আইন অনুযায়ী গ্রেফতার করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশের আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাঁর কী পরিণতি হতে পারে সে বিষয়ে তিনি অবগত। তবুও নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসবেন না। এর আগে রয়টার্সকেও তিনি দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।
এদিকে আইনমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতের রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার আইনের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তিনি যদি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনা দেশে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে। তিনি বলেন, "আইন আমাদের যে ক্ষমতা দিয়েছে, সেই ক্ষমতার মধ্যেই আমরা কাজ করব। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, পুরো বিষয়টি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।"
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে তাঁর ভ্রমণ নথি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, পাসপোর্টের বিষয়টি শেখ হাসিনার নিজস্ব সমস্যা। তবে তিনি যেভাবেই দেশে প্রবেশ করুন না কেন, বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন এবং ভারতে অবস্থান নেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয় বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়। তবে শেখ হাসিনা এই রায় ও তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, এসব মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে। তাঁদের আহ্বানেই তিনি দেশে ফিরে রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁর আস্থা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভারতের অবস্থানও স্পষ্ট
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে ভারতও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জানানো হয়েছে, মানবিক কারণে শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হলেও ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন না।
কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এটি ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির অংশ। কোনো বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে নিজ দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয় না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ করার পর বিষয়টি সংসদীয় কমিটিতে আলোচনায় আসে। একই আলোচনায় বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী এম আসাদুজ্জামান পুনরায় জানান, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলাগুলোর ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন নজর থাকবে তিনি শেষ পর্যন্ত কবে এবং কীভাবে দেশে ফেরেন, আর ফিরে এলে আইনগত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়।