বাংলাদেশ সংবাদ
দেশে নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার, শীর্ষে প্রায় আড়াই লাখ
নিজস্ব প্রতিবেদক, ২১ সেপ্টেম্বর :
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। ভাতা মিলিয়ে সর্বনিম্ন মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা থেকে, আর বিশেষ গ্রেডে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মোট বেতন হবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। নতুন কাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হলেও বর্ধিত মূল বেতন একবারে কার্যকর হচ্ছে না।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বেতন বাড়বে। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বেতন বৃদ্ধির ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এই হার যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পুরো বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে।
চলতি অর্থবছরে দুই দফায় বর্ধিত মূল বেতনের ৭০ শতাংশ পরিশোধের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া অর্থ দেওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বনিম্ন মোট বেতন হবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকায় একই গ্রেডে মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৬০০ টাকা যাতায়াত ভাতা, ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা এবং ১৫০ টাকা মুঠোফোন ভাতা যুক্ত হবে।
তবে নতুন বাড়িভাড়ার হার এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এটি কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ঢাকার ক্ষেত্রে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ, ১০ থেকে ১৫তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ৫ থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১ থেকে ৪র্থ গ্রেডে ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের মূল বেতন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, মুঠোফোন ও ধোলাই ভাতাসহ মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর বাইরে তাঁরা সার্বক্ষণিক গাড়িসহ অন্যান্য সুবিধা পাবেন।
প্রথম গ্রেডে মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। নবম গ্রেডে সর্বনিম্ন মোট বেতন ৬০ হাজার টাকার কিছু বেশি হবে। পদোন্নতি না পেয়ে একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক থাকলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাঁচটি স্তরে পেনশন বাড়ানো হয়েছে এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন দ্বিগুণ হয়ে ১৮ হাজার টাকা হবে। আর ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হবে।
বয়স অনুযায়ী পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ দুই সন্তানের ক্ষেত্রে মাসে ৩ হাজার টাকা করে এবং ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা শিক্ষাসহায়ক ভাতার বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোয় বাংলা নববর্ষ ভাতা ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২০ শতাংশ। পাহাড়ি, হাওর, চর ও দ্বীপ এলাকায় কর্মরত কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন অনলাইনে আইবাস প্লাস প্লাসের ‘পে ফিক্সেশন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। এজন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করতে হবে।
নতুন বেতনকাঠামোর আর্থিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, আগামী দেড় থেকে দুই বছরে রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন কাঠামোর ফলে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লেও এর পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পেতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত। আর নতুন বাড়িভাড়ার হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের শুরুতে।