ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের আবিস্কার

এন্টার্কটিকার  বরফস্তরের গভীরে সাড়ে তিন কোটি বছর আগের অরণ্যের সন্ধান

এন্টার্কটিকার  বরফস্তরের গভীরে সাড়ে তিন কোটি বছর আগের অরণ্যের সন্ধান

তথ্য কণিকা ডেস্ক : আজকের এন্টার্কটিকা মানেই চোখে ভাসে চাঁই চাঁই বরফ, তীব্র শীত আর জনমানবহীন সাদা প্রান্তর। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, এই মহাদেশ সব সময় এমন ছিল না। আন্টার্কটিকার বরফস্তরের প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে আবিষ্কৃত হয়েছে এক বিস্তৃত হারিয়ে যাওয়া অরণ্যের চিহ্ন—যার বয়স আনুমানিক সাড়ে তিন কোটি বছর।

ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট জেমিসনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় বরফের গভীরে ড্রিলিং করে পাওয়া গেছে উদ্ভিদের জীবাশ্ম, পরাগরেণু, গাছের পাতার টুকরো এবং প্রাচীন অণুজীবের নমুনা। এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকদের দাবি, এক সময় আন্টার্কটিকা ছিল ঘন সবুজ বনভূমিতে আচ্ছাদিত।


বর্তমানে আন্টার্কটিকায় যে অল্প কিছু উদ্ভিদ দেখা যায়, সেগুলি মূলত গুল্মজাতীয়। কিন্তু নতুন এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, অতীতে এখানে বড় আকৃতির গাছ ও বিস্তৃত অরণ্য ছিল। আজ যেখানে পেঙ্গুইনেরা ঘুরে বেড়ায়, কোটি কোটি বছর আগে সেই অঞ্চলই ছিল গভীর সবুজে ভরা।
গবেষণাটি পরিচালিত হয় পূর্ব আন্টার্কটিকার উইলকিস ল্যান্ড এলাকায়। প্রথমে বরফের স্তরের গঠন ও পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেই সূত্র ধরেই বরফের শক্ত আস্তরণে ড্রিলিং শুরু হয়। প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে পৌঁছে পাওয়া পলির স্তর থেকেই উঠে আসে হারিয়ে যাওয়া এক প্রাকৃতিক জগতের প্রমাণ।
বরফের নিচে জমে থাকা পলির নমুনায় পাওয়া জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানান, এগুলির বয়স প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর। অধ্যাপক জেমিসনের ভাষায়, “এটি এক ধরনের টাইম ক্যাপসুল। এটি এমন এক সময়ের গল্প বলে, যখন আন্টার্কটিকা আজকের মতো বরফে ঢাকা ছিল না।”
এই আবিষ্কারের পর গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়। কানাডার কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থা ‘র‌্যাডারস্যাট’-এর সাহায্যে বরফের স্তরের সূক্ষ্ম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ভূপৃষ্ঠে নদী ও উপত্যকার মতো গঠন শনাক্ত করেছেন। তাঁদের অনুমান, কোটি কোটি বছর আগে আন্টার্কটিকায় নদীপ্রবাহও ছিল।
গবেষকদের মতে, এই অরণ্যের অস্তিত্বের সময় আন্টার্কটিকা আজকের মহাদেশীয় রূপে গড়ে ওঠেনি। তখন এটি ছিল সুপার কন্টিনেন্ট ‘গন্ডোয়ানা’-র অংশ, যেখানে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল আন্টার্কটিকা। জুরাসিক যুগে, প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে, গন্ডোয়ানা ভাঙতে শুরু করলে ধীরে ধীরে পৃথক মহাদেশের সৃষ্টি হয়। সেই সময়ের পর আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে এই অরণ্য বরফের চাদরের নিচে চাপা পড়ে যায়।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার ভবিষ্যৎ জলবায়ু গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোটি কোটি বছর ধরে আন্টার্কটিকার বরফস্তর কীভাবে গঠিত ও পরিবর্তিত হয়েছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই তথ্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।