আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল: যেখানে রাতের অন্ধকারে জ্বলে মানবতার চুলা

আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল: যেখানে রাতের অন্ধকারে জ্বলে মানবতার চুলা

তথ্য কণিকা ডেস্ক:  শহর তখন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ছে। দোকানের শাটার নামছে একে একে। রাস্তার আলোয় ভিজে থাকা ফুটপাতে সারিবদ্ধ হয়ে বসে আছেন কিছু মানুষ—কেউ বৃদ্ধ, কেউ ভিক্ষুক, কেউ পথশিশু, কেউ বা দিনমজুর। কারও মুখে অভিযোগ নেই, নেই কোনো তাড়া। তারা জানেন, ঠিক রাত ১১টায় আসবে গরম ভাত, তরকারি, ডাল, আর কখনো মাংস। বিনিময়ে দিতে হবে না একটি টাকাও।

এই দৃশ্য কোনো এক রাতের গল্প নয়। বগুড়ার আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে টানা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে।

রাত ১১টা বাজলেই হোটেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ি। কর্মচারীরা প্লেট হাতে এগিয়ে যান বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে। কেউ কাউকে তাড়ায় না, কেউ কাউকে ছোট করে দেখে না। সবাই সমান। সবাই অতিথি।

অনেকেই খেয়ে হাত চেটে নেন। কারও চোখে তখন তৃপ্তির জল, কারও মুখে দীর্ঘদিন পর হাসি। এই হাসির পেছনে আছে এক মানুষের দূরদর্শী স্বপ্ন—মরহুম আলহাজ্ব আকবর আলী।

মুর্শিদাবাদ জেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া আকবর আলী ভাগ্য অন্বেষণে একসময় বগুড়ায় আসেন। হাতে তখন কোনো বড় পুঁজি নেই। ভাইয়ের সঙ্গে মেকানিক্যাল কাজ করতেন। লক্ষ্য করলেন, শহরে মুসলমানদের জন্য আলাদা কোনো খাবার হোটেল নেই। ক্ষুধার্ত মানুষ থাকলেও খাওয়ার জায়গা নেই।

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—হোটেল দেবেন।

কিন্তু টাকা কোথায়? শুরু করলেন মিষ্টি বানানো। ফেরি করে বিক্রি করতেন সেই মিষ্টি। ধীরে ধীরে জমে উঠল সামান্য পুঁজি। ১৯১১ সালে মাসিক আট টাকা ভাড়ায় ছোট্ট একটি ঘরে শুরু হলো আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল।

সেই ছোট্ট হোটেল দ্রুত মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে ওঠে। কম দামে ভালো খাবার, পরিষ্কার পরিবেশ, আন্তরিক ব্যবহার—সব মিলিয়ে হোটেলটির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

এক সময় মাসিক ১৫-২০ টাকায় তিন বেলা খাবার পাওয়া যেত। ঘি দিয়ে রান্না করা বিরিয়ানির দাম ছিল মাত্র এক টাকা প্লেট। ব্রিটিশ আমলে শহরে বিদ্যুৎ না থাকলেও আকবর আলী নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে হোটেলে আলো জ্বালিয়েছিলেন।

বগুড়ার বিখ্যাত সাদা সেমাইয়ের পেছনেও আছে তার অবদান। কলকাতা থেকে সেমাই আসত, কিন্তু দাম ছিল বেশি। সাধারণ মানুষ যেন কম দামে সেমাই খেতে পারে—এই চিন্তা থেকে নিজেই সেমাই তৈরির উদ্যোগ নেন আকবর আলী। সফল হন। সেই সেমাই আজ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও যায়।

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, মানবিক মানুষ হিসেবে।

ব্যবসায় উন্নতি হওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন—আয়ের একটি অংশ প্রতিদিন গরিব-মিসকিনদের খাওয়ানোর জন্য ব্যয় করবেন। রাত ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিনামূল্যে খাবার বিতরণ শুরু হয়।

১৯৭৫ সালে মৃত্যুর আগে তিনি ছেলেদের ডেকে বলে যান, এই নিয়ম যেন কখনো বন্ধ না হয়।

আজও বন্ধ হয়নি।

আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের এখন চারটি শাখা। কর্মচারী দুই সহস্রাধিক। প্রতিদিন রাতে এক মণেরও বেশি চাল রান্না হয় শুধু এই বিনামূল্যের খাবারের জন্য। গড়ে সাড়ে তিনশোর বেশি মানুষ এখানে একবেলা পেটভরে খেয়ে যান।

যত মানুষই আসুক, কাউকে ফিরতে হয় না।

এই শহরে বহু বড় ব্যবসায়ী আছেন। বড় বড় ভবন আছে। দামি গাড়ি আছে। কিন্তু কয়জন আছেন, যাদের ব্যবসার সঙ্গে এক শতাব্দী ধরে জড়িয়ে আছে মানুষের ক্ষুধা নিবারণের ইতিহাস?

রাত ১১টা। আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে বসে থাকা মানুষগুলো জানেন—আজও তারা না খেয়ে ঘুমোবেন না।

একজন মানুষ শত বছর আগেও না থাকলেও তার দয়া, তার আদর্শ, তার মানবিকতা আজও বেঁচে আছে—ভাতের গন্ধে, ধোঁয়া ওঠা হাঁড়িতে, আর তৃপ্ত মানুষের চোখের জলে।