হারানো শতাব্দী নয়: আব্বাসীয় যুগের পরও আরবি সাহিত্য জীবন্ত ছিল

হারানো শতাব্দী নয়: আব্বাসীয় যুগের পরও আরবি সাহিত্য জীবন্ত ছিল

তথ্য কণিকা ডেস্ক, ২৯ জানুয়ারি :  দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, আব্বাসীয় যুগের (৭৫০–১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) পর প্রায় ৮০০ বছর আরবি সাহিত্য স্থবির হয়ে গিয়েছিল। তবে ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলায় শেখ জায়েদ বুক অ্যাওয়ার্ডের আলোচনায় ভাষাবিদ ও সাহিত্য ইতিহাসবিদরা বলছেন, এটি মূলত পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি এক ‘ঔপনিবেশিক কল্পনা’। বাস্তবে আরবি সাহিত্য কখনো থেমে যায়নি।

ঐতিহাসিকভাবে, অষ্টম শতাব্দীতে বাগদাদ বিজ্ঞান, দর্শন ও কবিতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। আবু নুয়াস, আল-মুতানাব্বি, আল-ফারাবি ও ইবনে সিনার মতো কবি ও দার্শনিকদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল এক স্বর্ণযুগ। তবে ইউরোপীয় গবেষকরা একাদশ শতাব্দীর পর ‘সৃজনশীল স্থবিরতার যুগ’ বলে দাবি করেছিলেন।

গবেষকরা বলছেন, ধারণা ভুল
জার্মান গবেষক বেয়াট্রিস গ্রুন্ডলার তাঁর গ্রন্থ ‘দ্য রাইজ অব দ্য অ্যারাবিক বুক’-এ দেখিয়েছেন, নবম শতাব্দীর বাগদাদে বইয়ের বাজার, কপিকারদের প্রতিযোগিতা ও জনসম্মুখে পাঠ—সবই আধুনিক প্রকাশনা সংস্কৃতির পূর্বসূরি। তিনি বলেন, “বাগদাদের রাস্তায় হাঁটলে আপনি দেখতেন লোকেরা হস্তলিপি বিক্রি করছে, বিরামচিহ্ন নিয়ে তর্ক করছে—এ যেন এক জীবন্ত প্রকাশনা বাজার।”

গবেষকরা আরও দেখাচ্ছেন, সাহিত্য কেন্দ্র এক সময় বাগদাদ থেকে কায়রো, দামেস্ক ও আন্দালুসিয়ায় স্থানান্তরিত হলেও ধারাটি অব্যাহত থাকে। নতুন ঘরানা তৈরি হয়, পুরোনো ঘরানা রূপান্তরিত হয়। ফরাসি অধ্যাপক হাকান ওজকান বলেন, “‘জাজাল’ নামের কথ্য ছন্দভিত্তিক কবিতা আব্বাসীয় যুগের পরও বিকশিত হয়েছে। তাদের ছন্দ ও ব্যঙ্গ আধুনিক র্যাপের মতো প্রাণবন্ত।”

পুনরুদ্ধার ও অনুবাদে গুরুত্ব
দ্য ন্যাশনাল জানিয়েছে, আবুধাবির নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ‘আরবি সাহিত্য লাইব্রেরি’ প্রকল্প ইতিমধ্যেই ‘হারানো শতাব্দী’ হিসেবে বিবেচিত সময়ে ৬০টিরও বেশি সাহিত্যকর্ম পুনরুদ্ধার করেছে। প্রকল্প সম্পাদক অধ্যাপক মরিস পোমেরান্টজ বলেন, “এই বইগুলো সম্পাদনা করা মানে এক চলমান সংলাপে অংশ নেওয়া—প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেখক, অনুবাদক ও সমালোচক একে অপরকে উত্তর দিয়েছেন।”

মরিসের মতে, স্থবিরতার ধারণা মূলত অনুবাদের অভাব থেকেই জন্ম নিয়েছে। তিনি বলেন, “যখন কোনো লেখা অনুবাদ করা হয় না, তখন সেটি বৈশ্বিক অস্তিত্ব হারায়।” বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো এই সাহিত্যকে আবার জনসাধারণের কল্পনায় ফিরিয়ে আনা—স্কুলে পড়ানো, মঞ্চে উপস্থাপন করা ও অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া।

ফলে আরবি সাহিত্যের ‘হারানো শতাব্দী’ হিসেবে চিহ্নিত সময়টি আর কখনো অধরা থাকবে না।