৩০ শে জানুয়ারি জহির রায়হানের লোকান্তর দিবস উপলক্ষ্যে
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৮ ।। বাংলার সত্যজিৎ আমাদের জহির রায়হান

উৎসর্গ
জহির রায়হান
্একজন সাংবাদিক, সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক, চিত্রপরিচালক, প্রযোজক, চিত্রগ্রাহক, কাহিনিকার ও চিত্রনাট্য রচয়িতা, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী, বীর ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা
জহির রায়হান। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও রাজনীতিতে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নাম। দেশ স্বাধীনের অব্যবহিত পরেই, ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারিতে তিনি মীরপুর থেকে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান। আমার তরুণ বয়স থেকে চলচ্চিত্র ও সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন এবং গবেষণাধর্মী কিছু কাজের মাধ্যমে আমার কাছে মনে হয়েছে, তিনি বাংলার সত্যজিৎ রায়।
জহির রায়হানকে এ উপাধি দেওয়ার বহু কারণ রয়েছে। সত্যজিৎ রায় যেমন চলচ্চিত্রের যত শাখা আছে তার সবগুলোতেই অবাধে বিচরণ করেছেন, ঠিক তেমনি জহির রায়হানও করেছেন। সত্যজিৎ যেভাবে শিশুসাহিত্যসহ সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় বিচরণ করেছেন, তেমনি জহির রায়হানও সাহিত্যের প্রায় সব শাখা স্পর্শ করেছেন। পার্থক্য হচ্ছে, জহির রায়হান জন্মেছিলেন এক অজ পাড়া গাঁয়ে এবং বেড়ে উঠেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং বেঁচেছিলেন মাত্র ৩৬ বছর। আর সত্যজিৎ রায় জন্মেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায় এক অভিজাত জমিদার পরিবারে এবং বেঁচেছিলেন দীর্ঘ ৯২ বছর। ভারতে শিল্প-সাহিত্যের পাদপীঠে থেকে সত্যজিৎ নিজেকে বিকশিত হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিলেন। অন্যদিকে জহির রায়হান তৎকালীন পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় থেকে তেমন সুযোগ-সুবিধা পাননি। দু‘জনেই কিন্তু পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। জহির রায়হান স্বল্প জীবনে সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকে সেদিকেও সময় ব্যয় করেছেন। এদিকে, দীর্ঘ জীবনের অধিকারী সত্যজিৎ রায় সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না থাকায় চলচ্চিত্রে, লেখালেখি, ইলাসট্রেশন আাঁকা ইত্যাতি নান্দনিক বিষয়ে যথেষ্ট সময় দিতে পেরেছিলেন।

ভারতে চলচ্চিত্র, সাহিত্য ইত্যাদির বাজার অনেক বড়। তাদের বাজার বিশ্বব্যাপী। এদিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের বাজার বছরে এক মাসব্যাপী একুশে মেলায় সীমাবদ্ধ। কলকাতা তথা ভারতে মানুষ গড়ে প্রতি মাসে দুই-চারটি বই কিনে পড়ে। আর সপ্তাহে অন্তত একবার বা দুইবার পরিবার নিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখে। আমাদের দেশে এই কালচার তেমন নেই। ষাট, সত্তর ও আশির দশকে কিছুটা এ কালচার গড়ে উঠেছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে এই কালচারে ‘আলসার’ ধরে গেছে। যাক, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।
এই স্বল্পায়ু জীবনেই তিনি সৃষ্টি করে গেছেন কালজয়ী কথাসাহিত্য ও চলচ্চিত্র। সাংবাদিক, সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক, চিত্রপরিচালক, প্রযোজক, চিত্রগ্রাহক, কাহিনিকার ও চিত্রনাট্য রচয়িতা, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী, বীর ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা—সবই এই একটিমাত্র লোকের পরিচয়।
তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে, যা তৎকালীন নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক ছিলেন, পরে ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায় যোগ দেন। তিনি কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার অ্যাংলো-ফার্সি বিভাগে ভর্তি হন, কিন্তু ১৯৪৭ সালের বিভক্তি তাঁর শিক্ষাজীবনে বাধা সৃষ্টি করে। দেশভাগের পর তিনি পরিবারসহ কলকাতা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শেষ করেন তিনি।

তিনি যে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিখোঁজ হয়ে যান, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি ইতিহাসের এক ব্যথার অধ্যায়। তাঁর বড় ভাই, উপন্যাসিক ও রাজনীতিবিদ শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে তিনিও চিরতরে নিখোঁজ হন। আশ্চর্য বিষয় হলো, নিখোঁজ হওয়ার দিনটি ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২। এই সময় মীরপুর তখনও সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন হয়নি, যদিও ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সমগ্র বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছিল।
অল্প বয়সেই কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যুক্ত হন জহির। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। পার্টিতে কুরিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চিঠি ও সংবাদ পৌঁছে দেয়া ছিল তার কাজ।
জহির রায়হান শুধু নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার কারণে ইতিহাসে স্মরণীয় নন; তিনি শিল্প ও সাহিত্যে যা রেখে গেছেন, তা আজও অম্লান। তিনি উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে বাংলার সংস্কৃতিতে অনবদ্য অবদান রেখেছেন। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়, যা সাহিত্যজগতে তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তী সময়ে ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘তৃষ্ণা’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কতদিন’ এবং ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ উপন্যাসগুলোতে তিনি সমাজচেতনা, মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন।
জহির রায়হানের সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯৫০ সালে ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক ও সিনেমা পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সম্পাদক হন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু জহির রায়হানের লেখালেখি। তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
শেষ বিকেলের মেয়ে, তৃষ্ণা, হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন, বরফ গলা নদী, আর কতদিন, কয়েকটি মৃত্যু, একুশে ফেব্রুয়ারি।
ছোটগল্পে তিনি সময়, সমাজ ও মানুষের আবেগকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সোনার হরিণ, সূর্যগ্রহণ, সময়ের প্রয়োজনে, অপরাধ, ইচ্ছা অনিচ্ছা, ভাঙাচোরা প্রভৃতি গল্পে উঠে এসেছে সমাজচেতনা ও বাস্তবতার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।
জহির রায়হানের চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয় ১৯৫৭ সালে উর্দু ছবি ‘জাগো হুয়া সবেরা’-তে সহকারী পরিচালক হিসেবে। এরপর তিনি কাজ করেন ‘যে নদী মরু পথে’ ও ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে, যেখানে তিনি শিরোনাম সংগীতও লিখেছিলেন। ১৯৬০ সালে তিনি নিজের প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনও আসেনি’ পরিচালনা করেন, যা ১৯৬১ সালে মুক্তি পায়।
পরবর্তীতে তিনি ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন এবং ১৯৬৫ সালে প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ সম্পন্ন করেন। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে—সোনার কাজল (১৯৬২), কাচের দেয়াল (১৯৬৩), বেহুলা (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৭) এবং তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেওয়া’ (১৯৭০)।
‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রটি ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত। এই ছবিতে তিনি প্রতীকীভাবে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের বার্তা দিয়েছেন।
জহির রায়হান ছিলেন ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। ২১ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক আমতলা সভায় উপস্থিত থাকার জন্য তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়। এই আন্দোলনের প্রভাব তাঁর চিন্তাভাবনা ও শিল্পে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে তিনি তাঁর ইংরেজি ছবি Let There Be Light বন্ধ করে দিয়ে নির্মাণ করেন ইতিহাসখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর জহির কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যা নিয়ে নির্মাণ করেন ডকুমেন্টারি ফিল্ম স্টপ জেনোসাইড। চলচ্চিত্রটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে তিনি নির্মাণ করেন ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’। এই প্রামাণ্যচিত্রগুলো আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয় এবং সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন ও তপন সিনহা তাঁর কাজের প্রশংসা করেন। কলকাতায় প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন।

জহির রায়হানের পিতা ছিলেন মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ও মাতা সায়েদা সুফিয়া খাতুন। তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারও একজন বিখ্যাত লেখক ছিলেন। তিনি দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন—প্রথমে ১৯৬১ সালে অভিনেত্রী সুমিতা দেবী এবং পরে ১৯৬৮ সালে অভিনেত্রী শুচন্দার সঙ্গে। সুমিতার সঙ্গে তাঁর দুই ছেলে—বিপুল ও অনল রায়হান; আর শুচন্দার সঙ্গে দুই পুত্র—অপু ও টপু রায়হান।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে নিখোঁজ হন। জহির রায়হানসহ আরও কয়েকজনকে সে সময় মিরপুরের বিহারি ও পাকিস্তানি সহযোগীরা গুলি করে হত্যা করে বলে মনে করা হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ঘটনার কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কখনোই সম্পন্ন হয়নি।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন—আদমজি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭২), একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পদক (১৯৯২), বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০০৫)।
জহির রায়হান আজও বাঙালি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন এক অগ্রদূত, যিনি কলম ও ক্যামেরা—দুটো দিয়েই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। বাংলাদেশিদের দূর্ভাগ্য যে এমন একজন অসাধারণ সৃজনশীল ব্যক্ত্বিকে হাতের কাছে পেয়েও আমরা তাঁকে হারালাম অল্প বয়সে। তিনি তাঁর অনবদ্য সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে চিরদিন বেঁচে থাকবেন।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬