কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৯ ।। শবেবরাত: প্রচলিত আচার, হাদিসের মানদণ্ড ও সুন্নাহভিত্তিক বাস্তবতা
উৎসর্গ
যাঁরা জেনে বুঝে সঠিকভাবে ধর্ম পালন করেন- সেইসব মানুষকে
শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত এলেই আমাদের সমাজে এক বিশেষ ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়। চারদিকে আলো জ্বলে ওঠে, হালুয়া-রুটির আয়োজন হয়, মসজিদে ভিড় বাড়ে, কবরস্থানে মানুষের স্রোত নামে। অনেকেই বলেন—এই রাতে মানুষের ভাগ্য লেখা হয়, গুনাহ মাফ হয়, মৃত আত্মারা বাড়িতে ফিরে আসে, আর যে এই রাত জাগবে সে বিশেষ সওয়াব পাবে।
প্রশ্ন হলো—এই কথাগুলো কি সত্যিই কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত? নাকি এগুলো যুগে যুগে মানুষের মুখে মুখে গড়ে ওঠা ধারণা?
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো আবেগ দিয়ে নয়, বরং দলিল দিয়ে যাচাই করা। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, এ কলামের লেখক কোন আলেম বা মাওলানা নন। নিজস্ব ব্যক্তিগত পড়াশোনা থেকে তথ্য যাচাই বাছাই করে এ ধরনের ধর্ম সংক্রান্ত লেখার চেষ্টা। কারণ একজন মুসলিম হিসাবে সত্য জেনে, তা গোপন করা জায়েজ নয়। এ কলামের বিষয়ে কারো কোন বক্তব্য থাকলে, তিনি অনায়াসে ‘ভয়েস অব পিপল‘এ তা পাঠাতে পারেন। আমরা সাদরে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করতে সচেষ্ট হবো, যদি সেই মানের লেখা হয়।

১.শবে বরাত নামটি কোথা থেকে এলো?
‘শবেবরাত’ ফারসী বা ইরানী শব্দ। কুরআন ও সহীহ হাদীছে এই নামে কোনো রাতের উল্লেখ নেই। সাহাবীদের যুগেও এই নাম বা এই উপলক্ষে কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। সুতরাং শুরুতেই বুঝতে হবে—এই নামটি ইসলামের মৌলিক পরিভাষা নয়।
২. ভাগ্য লেখার রাত কি শাবানের ১৫ তারিখ?
অনেকে বলেন, এই রাতে সারা বছরের ভাগ্য লেখা হয়। তারা সূরা দুখানের আয়াত উদ্ধৃত করেন:
“আমি এটি অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে… এ রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।”
(দুখান ৪৪/৩-৪)
কিন্তু বিখ্যাত তাফসীরকার ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন—এই আয়াতের ‘মুবারক রজনী’ হলো লায়লাতুল ক্বদর, যা রামাযান মাসে।
কারণ আল্লাহ বলেন:
“রমযান মাস—যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।”
(বাক্বারাহ ২/১৮৫)
আর রাসূলুল্লাহ (সা:) স্পষ্ট করে বলেছেন:
“আসমান ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টির তাক্বদীর লিখে রেখেছেন।”
(মুসলিম ২৬৫৩)
অর্থাৎ ভাগ্য প্রতিবছর নতুন করে লেখা হয় না; বহু আগেই লেখা হয়ে গেছে।
৩. এই রাতে কি আল্লাহ বিশেষভাবে ক্ষমা করেন?
কিছু হাদিসে এসেছে—শা‘বানের ১৫ তারিখ রাতে আল্লাহ অনেক মানুষকে ক্ষমা করেন, তবে মুশরিক ও হিংসাপোষণকারীদের নয় (ইবনু মাজাহ ১৩৯০)।
কিছু আলেম একে গ্রহণযোগ্য বলেছেন, কিছু দুর্বল বলেছেন।
কিন্তু একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ:
এই হাদিসেও কোথাও বলা হয়নি—এই রাতে বিশেষ নামাজ, বিশেষ অনুষ্ঠান বা আলাদা ইবাদত করতে হবে।
বরং সহীহ হাদীসে এসেছে—
“আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন—কে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?”
(বুখারী ১১৪৫; মুসলিম ৭৫৮)
অর্থাৎ ক্ষমার দরজা প্রতিদিন রাতেই খোলা।
৪. ১০০ রাক‘আত নামাজ ও বিশেষ সালাত
আমাদের সমাজে যে ‘ছালাতে আল্ফিয়াহ’ (১০০ রাক‘আত) পড়া হয়, সে সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ একমত:
সব হাদীছ জাল।
(ইবনুল জাওযী, আল-মওযূ‘আত ২/১২৭)
এই নামাজ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ), সাহাবী বা তাবেঈন কেউ আদায় করেননি।
৫. মৃত আত্মারা কি এই রাতে বাড়িতে আসে?
এ ধারণার কোনো সহীহ দলীল নেই।
সূরা ক্বদরের আয়াতে যে ‘রূহ’ অবতরণের কথা আছে, তা হযরত জিবরাঈল (আঃ)।
(তাফসীর ইবনু কাছীর)
মৃত আত্মারা নির্দিষ্ট রাতে বাড়িতে আসে—এ কথা কুরআন-হাদীছ সমর্থন করে না।
৬. কবরস্থানে দলবেঁধে যাওয়া
রাসূলুল্লাহ (সা:) সাধারণভাবে কবর যিয়ারত করতে উৎসাহ দিয়েছেন।
কিন্তু নির্দিষ্ট করে শা‘বানের ১৫ তারিখ রাতে কবরস্থানে যাওয়ার কোনো সহীহ প্রমাণ নেই।
৭. শাবান মাসে সুন্নাত কী?
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন:
“রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোযা রাখতেন।”
(বুখারী ১৯৬৯; মুসলিম ১১৫৬)
অর্থাৎ শা‘বান হলো রামাযানের প্রস্তুতির মাস।
৮. মধ্য শাবানের ১৫ তারিখে নবী (সা:) এর কবর জিয়ারতের প্রসঙ্গ ও হাদিসের মান
অনেক সময় নারী ও পুরুষের ভূমিকা প্রসঙ্গে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়—যেখানে বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) মধ্য শাবানের ১৫ তারিখ রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে কবর জিয়ারত করছিলেন এবং হযরত আয়েশা (রা.) তাঁকে খুঁজতে সেখানে যান।
এই বর্ণনাটি বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন সনদে এসেছে। যেমন—ইবনে মাজাহ, তিরমিজি ও মুসনাদে আহমদের কিছু বর্ণনায় মধ্য শাবানের রাতের ফজিলত ও কবর জিয়ারতের কথা পাওয়া যায়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বর্ণনাগুলোর সনদগত মান নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে গুরুতর আপত্তি রয়েছে।
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুল জাওযি (রহ.) এসব বর্ণনাকে দুর্বল (দাঈফ) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, মধ্য শাবানের রাতের ব্যাপারে কিছু বর্ণনা এসেছে, কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই দুর্বল এবং নির্ভরযোগ্য নয়।
আধুনিক যুগের মুহাদ্দিস শাইখ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি (রহ.)ও এসব হাদিসের বড় অংশকে দাঈফ বা খুব দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
হাদিসশাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো আমল বা আকিদা প্রতিষ্ঠার জন্য সহিহ বা হাসান হাদিস প্রয়োজন। দুর্বল হাদিস দিয়ে শরিয়তের কোনো বাধ্যতামূলক বিধান বা বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না।
এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো আছে। যদি এই রাতে এত ফজিলত থাকতো, তাহলে নিশ্চয়ই রাসুল (সা:) জান্নাতুল বাকীতে জেয়ারতে যাবার আগে তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রা:) এবং অন্যান্য স্ত্রীদের অবশ্যই বলে যেতেন যে, তোমরাও এ রাতে বেশি বেশি করে নফল সালাত আদায় করতে থাকো, আর আমিও ঘরে এসে নফল সালাত পড়বো। তা না করে, রাসুল (সা:) একা একা জান্নাতুল বাকীতে চলে গেলেন, আর এত ফজিলতের রাতের বিষয়ে কিছুই বললেন না-এটা কি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়? আবার নবী (সা:) এর স্ত্রী এত রাতে কি কখনো এভাবে একা একা তাঁকে খুজতে বাইরে গেছেন কখনো? এভাবে একজন নবীর স্ত্রীর বাইরে যাওয়ার তো নিয়মও ছিল না।
সুতরাং একজন মুসলিম হিসাবে বিশ্বাস করতে হবে যে, রাসুল (সা:) জীবনের যত কিছু প্রয়োজনীয় ফরজ, নফল বা অন্যান্য দরকারী বিষয় সবই ওফাতের আগে তাঁর অনুসারীদের শিখিয়ে গিয়েছেন। তিনি কোন আমল না শিখিয়ে যাননি। এভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় এ ঘটনাটি সহি হবার কথা নয়।
তা্র রাসুলুল্লাহ (সা.) মধ্য শাবানের ১৫ তারিখ রাতে নির্দিষ্টভাবে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে কবর জিয়ারত করেছিলেন—এই বক্তব্যকে সহিহ প্রমাণিত বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। এছাড়াও চার খলিফার যুগে ৩০ বছর তাঁরাও আমাদের মতো শবেবরাত পালন করেছেন বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
৯. বিদআত থেকে সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে যার ওপর আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।”
(মুসলিম ১৭১৮)
ভাল নিয়ত থাকলেও ভুল পদ্ধতির আমল আল্লাহ গ্রহণ করেন না।
সুতরাং সারসংক্ষেপ করলে এ রাতে আমাদের করণীয় ও বর্জনীয় হচ্ছে:
- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ
- শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোযা
- তাওবা, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত
- রামাযানের প্রস্তুতি
বর্জনীয়:
- শবেবরাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ নামাজ
- আতশবাজি, আলোকসজ্জা
- প্রমাণহীন বিশ্বাস ও আচার
ইসলাম সহজ ও স্পষ্ট। রাসূলুল্লাহ (সা:) যে পথে চলেছেন, সেটাই নিরাপদ পথ। শা‘বান মাসকে উপলক্ষ করে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—নিজেকে সংশোধন করা, রামাযানের জন্য প্রস্তুত হওয়া এবং বিদ‘আত থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহ জ্ঞানের আলোয় চলার তাওফীক দিন। আমীন।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬